Thursday, April 12, 2018

Beirut Diary Part 3

বৈরুতে বনবাস ৩

আমি একটা জিনিস ভাবতে ভালবাসি, যেটা হচ্ছে প্রত্যেক দেশের আকাশ আলাদা আলাদা। ঢাকার আকাশ আর বৈরুত এর আকাশ কখনোই এক রকম লাগে নাই আমার কাছে। দুইটাই সুন্দর। লেবানন প্রকৃতপক্ষে এশিয়ার অন্তর্ভুক্ত হলেও, এটি মূলত ভূমধ্যসাগরীয় একটি দেশ। দেশটি খুব বেশি মাত্রায় ইউরোপ দ্বারা প্রভাবিত।

ভূমধ্যসাগর এর তীরে অবস্থিত হওয়ায় বৈরুত এর আবহাওয়া ছিল খুবই আরামদায়ক। সব সময় একটা বসন্ত বসন্ত ভাব। না ঠান্ডা, না গরম। এসি ছাড়া চলে না, আবার এসি বেশিক্ষণ চালিয়ে রাখলে ঠান্ডা লাগে--এরকম অবস্থা।

প্রথম দিনের অফিস দেখতে দেখতে শেষ হয়ে গেল। সবার সাথে আলাপ পরিচয় আর কুশল বিনিময় করতে করতেই দেখি বিকেল ৪ টা বাজে। মাঝে লাঞ্চ করতে গিয়েছিলাম, যার বর্ণনা আগেই দিয়েছি।

আমি ছিলাম ওদের কাছে রহস্যময় একটি চরিত্র, যার কারন অনেক পরে জেনেছি। সেদিনের বড় এজেন্ডা ছিল সব অধিদপ্তরের লোকজনের সাথে আমার পরিচয় করিয়ে দেয়া। আমি মার্কেট অপারেশান্স এ যোগ দিয়েছিলাম কনসাল্ট্যান্ট হিসেবে। এইচ আর, সেলস, ব্র্যান্ড, প্ল্যানিং, কাস্টোমার কেয়ার--দুই বিল্ডিং মিলিয়ে মোটামুটি ১০টি ফ্লোর জুড়ে ছিল তাদের অফিস।

আমার অফিসটি ছিল "শেভ্রোলে" নামক একটি জায়গায়। ভাবছেন জায়গার নাম কি করে গাড়ীর নামে হয়? এর কারন হল, সেই জায়গাটায় আগে শেভ্রোলে কোম্পানীর একটি সুবিশাল ফ্যাক্টরি ছিল, যেখানে বড় বড় গাড়ী তৈরি হত। ফ্যাক্টরি নেই, কিন্তু নাম টা রয়ে গিয়েছে।জায়গাটার অন্য একটি পোষাকী নাম ছিল, কিন্তু সেই নাম বললে কেউ চিনতো না, তাই আমি কখনোই তা ব্যবহার করিনি।

চাকুরীর সুবাদে এর আগেও বিদেশ ভ্রমণ হয়েছে কয়েকবার, কিন্তু এরকম লম্বা সময়ের জন্য নয়। এবং সে ট্যুর গুলোতে মূলত ২/৩ দিন থেকেছি, এবং অফিস-হোটেল-অফিস এরকম রুটিনেই ছিলাম মূলত। সেবারই প্রথম সম্পূর্ণ স্বাধীন ভাবে বিদেশ যাত্রা বলা যায়। অফিস শেষে আর উইকেন্ডে কি কি আমোদ ফূর্তি করবো এ চিন্তায় আমি কিঞ্চিত উদ্বেলিতই ছিলাম বলা যায়।

ছয়টার দিকে অফিস থেকে বের হয়ে আবিষ্কার করলাম যে পাশেই একটি বড় সড় বার্গার কিং। এর আগে মালয়েশিয়া তে গিয়ে টুইন টাওয়ারের নিচে বার্গার কিং এর বার্গার খেয়েছিলাম, এবং জীবনে প্রথম বারের মত আনলিমিনিটেড সফট ড্রিংক্স এর অপশান পেয়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। সাত পাঁচ চিন্তা না করে ঢুকে গেলাম ভেতরে। আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম যে হোটেলে গিয়ে আর বের হব না, একবারে ডিনার করেই হোটেল ফিরবো।

"Double Whopper" মিল এর দাম দেখলাম মাত্র ২ ডলার। একটা ডাবল বার্গার, ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস আর এক গ্লাস কোকা কোলা-এই হল মিল। এখানে অনন্ত কোমল পানীয়ের অফারটি ছিল না, তবে তাতে দুঃখ পাইনি এক্টুও।

মেনুর পাশে বড় বড় করে লেখা দেখলাম যে আর ১ ডলার যোগ করলেই আমি আমার মিলটা কে এক্সট্রা লার্জ করে নিতে পারবো। সেটাই নিলাম। অর্ডার দিয়ে কিউ তে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে দেখলাম মোটামুটি সবাই বাচ্চা কাচ্চা নিয়ে এসেছে ওখানে। কোন একাকী খাদক কিংবা জুটি দেখলাম না, সবার সাথেই ছোট ছোট বাচ্চা কাচ্চা, এবং সবার পরনেই হাল ফ্যাশানের পশ্চিমা পোষাক। সেখানে স্যুট টাই পরা নিজেকে খুবই বেমানান লাগছিল।

আমি ব্যক্তিগত ভাবে স্যুট টাই খুবই অপছন্দ করি। আমার কাছে স্মার্ট ক্যাজুয়াল হচ্ছে সেরা পোষাক। তারপরেও ভাবলাম "দেশের সম্মান", একটা বিদেশী অফিসে জাচ্ছি , সেখানে একটু ফর্মাল না পড়লে কিভাবে হয়?

সেদিন অফিসে অবশ্য সবাই ক্যাজুয়াল পোষাকে ছিল, আমি প্রথমে ভেবেছিলাম শুক্রবার, সপ্তাহের শেষ দিন বিধায় সবাই ক্যাজুয়াল পড়েছে। কিন্তু পরে জানতে পারি যে ওখানে ড্রেস কোড খুবই শিথিল।

কিছুক্ষণ পর যখন আমার হাতে একটা ট্রে ধরিয়ে দেয়া হল, আমার চোখ কপালে উঠে গেল। বার্গার এর সেই প্রমাণ সাইজ আমি আজো ভুলতে পারিনি। দুই হাতেও ধরতে পারছিলাম না ঠিকমত, এত বিশাল সেই এক্সট্রা লার্জ বার্গার। আমাকে যারা ব্যক্তিগত ভাবে চেনে, তারা জানে আমি অনেক বড় ধরনের খাদক। আমাকে দেখলেও অবশ্য সেটা বোঝা যায়। সেই আমি অনেক কষ্ট করেও পুরো বার্গার শেষ করতে পারলাম না। ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস যা ছিল তা দিয়ে দেশে ৪-৫ জন মানুষের পেট ভরে যেত, আর কোক এর গ্লাসটি কে মনে হয়েছিল অন্তহীন। বরফ দিতে মানা করে দেয়াতে আসলেও পরিমাণে অনেক বেশি পেয়েছিলাম।

আসার সময় রাস্তা চিনে রেখেছিলাম। সেদিন পণ করেছিলাম যে ট্যাক্সি ভাড়া বাচানোর জন্য মাঝে মাঝে হেটে হেটে বাড়ী ফিরবো। সেদিন প্রথম দিন হওয়া তে ডিনার করার পর পরই ট্যাক্সি নিয়ে চলে গেলাম হোটেলে।

এ ভাবেই শেষ হয়ে গেল লেবাননে আমার প্রথম দিনটি।


Saturday, April 07, 2018

Beirut Diary Part 2

বৈরুতে বনবাস পর্ব ২

ব্যাখাতীত ঘটনা টা জানি কি ছিল? ইতালীয় ভাষার এক বর্ণও না জেনে সেই ভাষার একটি গান মাথার মধ্যে ঢুকে যাওয়া! রাস্তা ঘাটে, শপিং মল ও কফি শপে, সবখানেই we no speak Americano গানটি বাজতে থাকতো।তখন অবশ্য গানটার নাম জানতাম না। জেনেছি অনেক পরে। সে আরেক কাহিনী। 

ইমিগ্রেশানের সকল কাজ কর্ম সেরে এয়ারপোর্ট থেকে হোটেলে পৌছাতে পৌছাতে রাত ৯ টা বেজে গেল। পেটে তখন খিদের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছিল। কোন মতে হোটেলে জিনিসপত্র রেখে বের হলাম খাদ্যের খোজে।

হোটেলটি ছিল বেশ উচু একটি জায়গায়। ঢালু রাস্তা সোজা নেমে গিয়েছে নিচের দিকে, এবং সেই রাস্তা বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। বৈরুত সম্পর্কে তেমন কোন পূর্ব ধারণা ছিল না; ভেবেছিলাম মধ্যপ্রাচ্যের আর আট দশটা শহরের মতই হবে। আমি ল্যান্ড করেছিলাম বৃহস্পতিবার, কোন উইকেন্ডেও না।

যখন বের হলাম রাস্তায়, চারিদিক শুনশান। সব দোকানপাট বন্ধ। হোটেল এর চার পাশে দেখার মট কিছু ছিলই না, প্রচুর পরিমাণে বড় বড় অট্টালিকা আর গাড়ীর সমাহার ছাড়া। প্রায় ১৫ মিনিট হেটেও দৃশ্যপটের তেমন কোন পরিবর্তন হল না । পুরাই এক শহুরে জংগল।

প্রতিটি রাস্তার দুইধারেই অসংখ্য গাড়ী পার্ক করে রাখা; আশে পাশে কেউ নেই। কোন কোনটায় পুরু ধুলার আস্তরণ দেখে নিশ্চিত হলাম যে মাসের পর মাস এগুলো এখানেই আছে। প্রথম যেই চিন্তা টা মাথায় এল সেটা হচ্ছে--"বৈরুতে যদি একটা ধোলাইখাল থাকতো, তাহলেই খবর ছিল এই গাড়ী মালিক গুলোর।" 

অনেকক্ষন হেটে হেটে একটা জায়গায় পৌছুলাম, যেখানে পাশাপাশি বেশ কিছু রেস্তোরাঁ ছিল। বেশি ভীড় এর কোন জায়গায় যেতে ইচ্ছে করছিল না। মোটামুটি ফাঁকা একটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে পড়লাম। বাইরে থেকে দেখে মনে হল এখানে রুটি কাবাব জাতীয় খাবার পাওয়া যেতে পারে। পেট ভরানোর মত পরিচিত খাবার পাওয়াটাই তখন ছিল একমাত্র বিবেচ্য বিষয়। মনে পড়ে গিয়েছিল হোটেল গ্রোভার ইন গল্পে প্রিয় লেখক হুমায়ুন আহমেদ এর ফ্রেঞ্চ টোস্ট অর্ডার দেয়ার কাহিনী। 

রেস্টুরেন্ট এর ম্যানেজার কিসিমের একজন জানালো আমি চাইলে দোতালায় খোলা আকাশের নিচে বসতে পারি। সেদিনের আবহাওয়া ছিল চমৎকার, ঠান্ডাও না, গরম ও না। প্রস্তাব মনে ধরায় গিয়ে বসলাম উপরের ফ্লোরে। এখানেও সেই একই ভিউ। বিভিন্ন সাইজের নতুন পুরনো অট্টালিকা আর অল্প কিছু গাছ গাছালি।  ততক্ষণে ব্যাপারটার সাথে চোখ সয়ে গিয়েছে।সিত্রোয়া, আলফা রোমিও, পন্টিয়াক, শেভ্রোলে, ড্যাটসান এর মাঝে একটাও টয়োটা চোখে পড়লো না। 

একজন হাসিখুসী ভদ্রমহিলা এলেন অর্ডার নিতে। মেনুতে দেখলাম রিব আই স্টেক আছে, দাম ঢাকা শহরের তুলনায় কমই মনে হল। মজার ব্যাপার হল, লেবাননে ওদের দেশীয় মুদ্রার পাশাপাশি ইউএস ডলারও ব্যবহার করা যায় কোন বাধা ছাড়াই। মুদ্রাস্ফিতির কারণে ১ ডলার ভাংগিয়ে তখন প্রায় ১,৫০০ লেবানিজ পাউন্ড পাওয়া যেত, যা লেনদেন এর জন্য অসুবিধাজনক ছিল। একটি বার্গার খেলেন? বেরিয়ে গেল ৩০০০ টাকা! এক বোতল পানি কিনবেন? দাম ৭০০ টাকা। এরকম আর কি! সে কারণে অনেকেই ডলার দিয়েই সারতেন লেনদেন; মূল্য তালিকাতেও ডলারে দাম দেয়া থাকতো। নিজেকে আমেরিকান আমেরিকান মনে হচ্ছিল। 

দেখলাম স্টেক এর দাম $9.99, যা বাংলাদেশী স্ট্যান্ডার্ডে মোটামুটি সস্তাই বলা যায়। কথা প্রসংগে ফাতিমার কাছ থেকে তার নামের পাশাপাশি আরো জানতে পারলাম যে স্টেক টির ওজন হবে প্রায় ৩০০ গ্রাম এর মত এবং সাথে ম্যাশড পটেটো ও স্টিমড ভেজিটেবল দেয়া হবে, এবং আমি ৫০ সেন্ট যোগ করে দু'খানা আরবীয় খুবজ রুটিও এড করে নিতে পারবো অনায়াসে। পানীয় কি খাব জানতে চাওয়াতে আমি "এক বোতল ঠান্ডা পানি" চাইলাম।

অন্য রেস্তোরার ওয়েটারের মত উনি উধাও হয়ে গেলেন না। কিচেনে অর্ডার বার্তা পৌছে দিয়ে বারবার এসে এসে নানা খোজ খবর নিতে লাগলেন। আমি কই থাকি, কোথা থেকে এসেছি, কেন এসেছি, ইত্যাদি ইত্যাদি। তার ইংরেজী ছিল এক্সেন্টেড। আমরা ইংরেজী ছবিতে আরব টেররিস্ট দের যেরকম ইংরেজী বলতে শুনি, অনেকটা সেরকম। 

বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর এল কাঙ্ক্ষিত খাবার। সাথে পেলাম সবুজ এক বোতল পানীয়। জিজ্ঞাসু নেত্রে মহিলার দিকে তাকালে সে জানালো আজকেই তাদের রেস্তোরাঁর ওপেনিং হয়েছে, আর এজন্য সব কাস্টোমার দের ফ্রি একটা ড্রিংক দেয়া হচ্ছে। আমি কি দরকার ছিল, এইসব খাই না লাইনে কিছু একটা বলা শুরু করতে না করতেই সে হড়বড় করে বলে উঠলো "তুমি শুধু মাংশ অর্ডার দিয়েছ। এর সাথে এই পানীয় পারফেক্ট কম্বিনেশান। আমরা এই জিনিস ছাড়া স্টেইক খাওয়ার কথা কল্পনাও করতে পারি না। চেষ্টা করে দেখ।"

খাওয়া শেষ হতে বেশ খানিকক্ষণ লাগলো। প্লেন থেকে নামার পর যে অপরিসীম বিষন্নতা আমাকে গ্রাস করেছিল তা এই ঘরোয়া পরিবেশের রেস্তোরাঁ অনেকটাই দূর করে দিয়েছিল। মনে হয়েছিল পরবর্তী দু'মাস এখানেই ডিনার করবো। তবে বাস্তবে আর মাত্র একবারই আসা হয়েছিল এখানে। সেদিনের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। যথাসময়ে বলবো। 

বিল চুকিয়ে বের হলাম যখন, তখন রাত ১০ঃ৩০। আমার জন্য তেমন কোন রাতই না, কিন্তু বৈরুত স্ট্যান্ডার্ডে নিশুতি রাত মনে হল। রাস্তায় কাক পক্ষীও নাই। হেটে হেটে অনেকদুর চলে এসেছিলাম একটি মাত্র ভরসায় যে হোটেল এর নাম ঠিকানা লেখা একটি কার্ড রয়েছে সাথে, যেটি দেখালে ট্যাক্সি ড্রাইভার পৌছে দেবে জায়গা মত।

পরেরদিন সকাল ৯ টার মধ্যে অফিসে পৌছাতে হবে। সে চিন্তায় আচ্ছন্ন হতে হতে একটি ট্যাক্সি পেয়ে গেলাম। ট্যাক্সিওয়ালা প্রথমেই আমাকে জিজ্ঞেস করলো "ট্যাক্সি?"। আমি অবাক হয়ে তার দিয়ে চেয়ে রইলাম। মনে মনে ভাবলাম "আরে বেটা ট্যাক্সি লেখা সাইন আছে দেখেই তো তোর গাড়ীতে উঠসি"। কিছু না বুঝেই বললাম ওকে। সে বেশ খুশী হয়ে গাড়ী হাঁকাল আমার হোটেলের উদ্দেশ্যে। ভাড়াটা একটু বেশি মনে হলেও আর তেমন কিছু বললাম না।






Wednesday, March 21, 2018

Beiruit Diary Part 1

পৃথিবীতে অনেক ব্যাক্ষাতিত ঘটনা ঘটে। যেমন, এই মূহূর্তে জনাকীর্ণ কফি শপে দুই ভদ্রলোক অর্ডার দিচ্ছেন ২টা এপেল জ্যুস এবং ১টি অরেঞ্জ জ্যুস। এগুলো ফ্রেশ জ্যুস নয়, ক্যানের, প্রসেস করা জ্যুস। কে জানে কেন উনারা জ্যুস খেতে কফি শপে এল?

আজ হতে প্রায় ৯ বছর আগে কর্মসূত্রে লেবানন গিয়েছিলাম ৩ মাসের একটা প্রজেক্ট এ অংশ নেয়ার জন্য। সেটাই ছিল আমার জীবনে প্রথম বারের মত এত দীর্ঘদিনের জন্য বাসা থেকে দূরে থাকা। আমি কখনোই হলে থাকি নাই, আর স্কুল কলেজ ইউনিভার্সিটি ঢাকাতেই হওয়াতে কখনোই বাসার বাইরে বেশি থাকা হয় নি। 

দুবাই এয়ারপোর্টে ৮ ঘন্টার সুদীর্ঘ ট্রানজিট শেষ করে যখন রাজধানী বৈরুত এর রফিক হারীরী এয়ারপোর্টে নামলাম, তখন আমি পুরোপুরি বিধ্বস্ত। ঢাকায় লেবানন এর কোন দূতাবাস ছিল না। অনেক ঝামেলা করে অফিস মারফত একটি চিঠি জোগাড় হয়েছিল, যেখানে আরবী তে লেখা ছিল যে এই ভদ্রলোক কে যেন "অন এরাইভাল" ভিসা দেয়া হয়। 

ঢাকা এয়ারপোর্টেই প্রচুর ঝামেলা পোহাতে হয় আমাকে। এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশান অফিসার রা সেই কাগজের ভরসায় আমাকে প্লেনে উঠতে দিতে চাচ্ছিলেন না। পরবর্তীতে অফিসের সহায়তায় সেই ঝামেলা মিটে।

বৈরুত বিমান বন্দরেও অনেকক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়েছিল ভিসার জন্য। আমার সাথে আসা যাত্রীরা সবাই যখন মোটামুটি বাসায় পৌছে গিয়েছে, আমি তখনো লাগেজ হাতে নিয়ে বেকুবের মত দাঁড়িয়ে ছিলাম। মজার ব্যাপার হল ওখানের ইমিগ্রেশান অফিসার গুলো খুব হাল্কা মেজাজে ছিল। আমাকে নানা রকম মজার মজার প্রশ্ন করছিল।

সিকিউরিটি চেক এর এরিয়াতে গিয়ে দেখি যে লোক টা ব্যাগ চেক করছে, সে সিগারেট টানে। পাশেই বড় করে "নো স্মোকিং" লেখা। আমি খুব অবাক দৃষ্টিতে তাকালাম ওর দিকে । সে কিছুটা বিব্রত হয়ে আমার দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টি দিয়ে মাথা নেড়ে জিজ্ঞেস করলো, "what happened?".

আমি কিছু না বলে নো স্মোকিং সাইন টার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করলাম। 

সে বিন্দুমাত্র ঘাবড়ে না গিয়ে কিছু আদিরসাত্নক অংগভংগী করে বল্লো "তুমি এগুলা কর না?"। আমি কিছু না বুঝে হা করে তাকায় থাকতে থাকতে শুনলাম সে বল্ল "ওগুলাও তো নিষিদ্ধ, তাও সবাই করে"। আমি টাস্কি খেলাম, কিন্তু কিছু বললাম না। পাছে আমার ভিসা আটকে যায়!

আমাকে অফিস থেকে জানিয়ে দেয়া হয়েছিল যে আমার জন্য এয়ারপোর্টে গাড়ী রাখা থাকবে। রোমিং সিম দিয়ে কল করলাম সেই ড্রাইভার কে। সে আমার কথা প্রায় কিছুই বুঝলো না, আর আমিও বুঝলাম না প্রত্যুত্তরে সে ইয়েস নো হাবিজাবি কি বল্ল । তখন বুঝলাম কেন আমাকে নির্দিষ্ট একটি ডিপারচার গেট দিয়ে বের হতে বলা হয়েছিল, এবং কেনই বা গাড়ীর রেজিস্ট্রেশান নাম্বার ও আগে থেকে দিয়ে দেয়া হয়েছিল! গিয়ে হেটে হেটে খুজে বের করলাম গাড়ী, আর বিনা বাক্য ব্যায়ে উঠে পড়লাম সেটায়।

চালক ভদ্রলোক এক বর্ণ ইংরেজী ও জানতেন না, এবং উনি চেষ্টাও করলেন না আমার সাথে কোন কথা বলার। 

লেবানন এর অফিশিয়াল ভাষা আরবী, ফ্রেঞ্চ এবং ইংরেজী। বেশিরভাগ মানুষ আরবী আর ফ্রেঞ্চ জানে, ইংরেজী জানা মানুষ খুব কমই পেয়েছি পরবর্তী দুই মাসে। 

অফিসের কাছাকাছি একটা হোটেলে গিয়ে উঠলাম। এখানে ছিলাম দুই সপ্তাহ। প্রতিদিন সকালে হোটেলের বুফে নাস্তা খেতে নামতাম ৮ টার দিকে। একই খাবার খেতে খেতে যখন আমি প্রায় ত্যক্ত বিরক্ত, তখন আমাকে অফিস থেকে জানানো হল যে হোটেল এর পরিবর্তে আমাকে একটা স্টূডিও এপার্ট্মেন্টে থাকতে দেয়া হবে। 

ডেকওয়ানেহ নামক একটা এলাকায় ছিল সেই এপার্ট্মেন্ট। পরবর্তী ২ মাস সেটি হয়ে উঠলো আমার নিজের বাসা। একটা রুম, সেটার মধ্যেই ছোট কিচেনেট আর সাথে ছোট ওয়াশরুম। কাপড় ধোয়ার জন্য কমন ওয়াশিং রুম ছিল বেইসমেন্ট এ। 

অফিস শুরু হত ৯ টা থেকে। প্রথম দিন থেকেই একটি বিরুপ মনোভাব লক্ষ্য করলাম আমার নতুন কলিগদের মাঝে। তারা হয়তো মেনে নিতে পারছিল না যে বাংলাদেশী এক ভদ্রলোক কন্সাল্টেন্ট হিসেবে তাদের উপর ছড়ি ঘুরাবে। মার্কেট অপারেশান্স ডিপার্ট্মেন্ট এ তখন কর্মরত ছিলেন পাঁচ জন ভদ্রমহিলা এবং তিন জন ভদ্রলোক। হেড মার্কেটিং ছিলেন তাদের বস। 

আমি কোন মতে ৮টায় উঠে ঘুম ঘুম চোখে অফিসে আসতাম, আর দেখতাম আমার কলিগ গুলোকে অবাক দৃষ্টিতে। সবাই থাকতো সুসজ্জিত এবং দেখে মনে হত কোন পার্টিতে এসেছে, অফিসে নয়। খুব হই হুল্লোড় করতো ওরা সবাই, কিন্তু আমি আরবী না জানায় তাদের কাহিনী গুলা বুঝতাম না একদমই। কখনো কখনো করুনার বশবর্তী হয়ে ইংরেজী তে তর্জমা করে আমাকে শুনাতো ওদের কাহিনী গুলো। 

ইউসুফ এর সাথে আমার কিছুটা সখ্যতা হয়। তাকে সবাই "জো" বলে সম্বোধন করতো। ওর বয়স আমার মতই ছিল, কিন্তু সে ছিল খুবই স্মার্ট এবং অসম্ভব সুপুরুষ। টিম এর অপর দুই ভদ্রলোকের মধ্যে লুইস এর সাথে খুব একটা কথা হত না। সে নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকতো। মূলত আমি, জো আর নিকোলাস মাঝে মাঝে আড্ডা দিতাম আর দুপুরে লাঞ্চে যেতাম একসাথে। 

লাঞ্চ এর ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। সব কর্মী অফিস ক্যান্টিনে ফ্রি লাঞ্চ পেত, এবং সেই লাঞ্চ ও ছিল খুব চিন্তা ভাবনা করে বানানো। 

সবাইকে প্রথমে একটা ছোট বাটি, প্লেট এবং ছুরি, কাটা আর চামচ দিয়ে দেয়া হত। আইডি কার্ড দেখালে এই জিনিসগুলো পাওয়া যেত। তারপর প্রথমেই বিশাল সালাদ বারে যেত সবাই। সেই বাটি ভর্তি করে একবারের মত সালাদ নেয়া যেত সেখান থেকে। একপাশে থাকতো কিছু "আগে থেকে বানিয়ে রাখা সালাদ"। ওগুলো নিলে বাটি ফিরিয়ে দিতে হত। আর অন্যপাশে থাকতো সালাদের বিভিন্ন টাটকা উপকরণ। 

ভেতো বাংগালী হিসেবে সালাদ খাওয়ার খুব একটা অভ্যাস কখনোই ছিল না, আর সালাদ বলতে আমি তখন শসা গাজর টমেটোই বুঝতাম। ওইখানে গিয়ে ধারণা পালটে গেল পুরাপুরি। শসা, গাজর, টমেটো তো থাকতোই, পাশাপাশি, বীট, শীমের বিচি, লেটুস, আলু, ডিম, অ্যাপেল, পীচ সহ আরো অনেক ধরণের উপাদান থাকতো সেখানে। এর সাথে মেশানোর জন্য থাকতো বিভিন্ন ধরনের তেল এবং সালাদ ড্রেসিং। অনেকে দেখতাম সালাদ টাই অনেক আয়োজন করে খেত, মেইন ডিশ আর নিতই না।

মেইন ডিশের ক্ষেত্রে ২/৩ ধরনের অপশান থাকতো। হালাল সহ। সেখানেও অনেক বাহারী খাবার থাকতো। এম্নিতে লেবানিজ খাবার খুবই সুস্বাদু; ওরা কিছু ভূমধ্যসাগরীয় শৈবাল ব্যাবহার করে রান্না, যাতে রান্নার স্বাদ অনেক বেড়ে যায়। এগুলো "মনোসোডিয়াম গ্লুটামেট কিংবা আজি নো মোটোর" মত ক্ষতিকারক না, বড়ং স্বাস্থ্যকর। 

শেষ আইটেম হিসেবে একটা ডেজার্ট ও থাকতো।

খাওয়া দাওয়া করে অফিসে ফিরতাম। অফিসে শুধু এস্প্রেসো কফি পাওয়া যেত, যা আমার সহ্য হোত না। লাঞ্চ পরবর্তী চা কফির জন্য মনটা আঁকুপাঁকু করতো, কিছু বলতেও পারতাম না, সইতেই পারতাম না। পরবর্তীকালে অফিসের কাছে একটা কফি শপ আবিষ্কার করেছিলাম, কিন্তু সেই গল্প আরেকদিন।

সবাই বের হয়ে যেত ৫ টার দিকে। যতদিন ছিলাম ওখানে, এই নিয়মের কোন ব্যতিক্রম দেখিনি। তবে আমি থাকতাম আরো কিছুক্ষন। ৭-৮ টার দিকে বের হতাম; সরাসরি বাসায় যেতাম। খুব বিষন্নতায় কাটতো সন্ধ্যা গুলো। মিস করতাম দেশে ফেলে আসা সবাইকে। 

হোটেলের ওয়াইফাই খুব বাজে ছিল; কোন মতে yahoo mesenger চালানো যেত, যা দিয়ে অডিও কল করতে পারতাম। কিন্তু কল ড্রপ হত প্রায়শই। অফিস থেকে একটা সিম দিয়েছিল, কিন্তু আইএসডি কল রেট অনেক বেশি ছিল, আর রোমিং সিমে ছিল আরো বেশি। কলিং কার্ড নামক বস্তুটি আমার কাছে তখনো অচেনা। 

টিভি তে ছিল সব আরবী চ্যানেল; লেবানিজ গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়তাম প্রায় দিন। 


Sunday, March 18, 2018

জানালার পাশে পর্ব ৪

অনেকক্ষণ ধরে গাড়ীর স্টার্ট বন্ধ। ফুয়েল ট্যাংক প্রায় খালি। এখন গাড়ী চালালেও খুব বেশী দূর যেতে পারবে না নীল। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ড্রাইভিং সিট দখল করে আছে মিরিন।

রকি বিচের ঢেউ গুলোর কোন বিকার নেই। বিরতিহীন ভাবে আছড়ে পড়ছে পাড়ে। শব্দটা যেন বহুদুর থেকে আসছে। কানে ঢুকছে, আবার ঢুকছে না। আলাদা করে খেয়াল করার মত না, আবার অবজ্ঞা করার মতও না। একেক টা ঢেউ যেন নাড়া দিয়ে যাচ্ছে মষ্টিষ্কের কোন এক বিশেষ জায়গায়, মনে পড়ে যাচ্ছে টুকরো টুকরো স্মৃতি।

প্রায় দুই ঘন্টা ধরে একই জায়গায়, একই ভাবে বসে আছে ও।  চারপাশের পটভূমিকায় তেমন কোন পরিবর্তন নেই। মনে হচ্ছে যোহান স্ট্রাউস একটানা বাজিয়ে যাচ্ছে তার নীল দানিউব সিম্ফনি। কখন জানি গাড়ীর স্টেরিও বন্ধ হয়ে কল্পনার সংগীত বাজা শুরু হয়েছে। এই সুর তার চির চেনা, জীবনে অসংখ্য বার শুনেছে ও। এত বেশি যে চোখ বন্ধ কর হাত দু'টো মাথার পেছনে নিয়ে হেলান দিলেয় বাজা শুরু হয়। আজকে বোনাস হিসেবে সাথে আছে ঢেউ এর বাজনা।।

১ টা ১১ মিনিটে একটি পুলিশ প্যাট্রল কার দেখতে পেল নীল। ডজ চার্জার গাড়ীটির ক্রম অগ্রসরমান অবয়ব দেখে আশাবাদী হয়ে গেল ও। সম্ভবত অফিসারটি তার শিফট শেষ করে বাড়ীর পথে যাচ্ছিল। বিচের ধারে থেমে থাকা ধূসর ফোর্ড মাস্ট্যাং গাড়ীটিকে দেখেও দেখলো না কেন জানি। এমন কি, গতিও কমালো না একটু। কিছুটা মন খারাপ, আর কিছুটা আশ্বস্ত হওয়ার মিশ্র অনুভূতি হল নীল এর। হয়তো বা সেই অজানা পুলিশ অফিসারটা বেচে গেল শেষ রাতের উদ্ধার কর্ম থেকে।

আসলেই কি একজন পুলিশ অফিসার পারবে নীল ও মিরিন কে উদ্ধার করতে? ভাবতে ভাবতে হেসে উঠলো নীল। হাত বাড়ালো গ্লোভ কম্পার্ট্মেন্ট এ। ওখানেই লাইটার আর রথম্যানস এর কিং সাইজ প্যাকেট। খুলেই মনে পড়লো, গত সপ্তাহেই রাগ করে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে মিরিন ওর সাধের সিগারেট আর লাইটার।

এ তো এক ধরনের ভালবাসাই, নাকি? ডাক্তার তো মানাই করেছে ধুম্রশলাকা টানতে। কিন্তু, কিন্তু, এ তো এক ধরনের অত্যাচারও, নাকি? আর ভাবতে পারে না নীল। চিৎকার গুলো কানে বাজতে থাকে। চিল কন্ঠি মিরিন...

সময় থেমে আছে বীচের ধারের এক টুকরো কাজ চালিয়ে নেয়ার পার্কিং স্পেস এ। হাত ঘড়িটির দম ফুরিয়ে গেছে, ১ঃ১১ তেই থেমে আছে কাটা। অন্য যেকোন দিন হলে নীল প্যানিক এটাক এর শিকার হত। ঘড়ির কাটার সাথে মিলিয়ে তার এক্সিকিউটিভ জীবন। হয় ঘড়ি নাহলে মোবাইল, যেকোন এক মাধ্যমে সময় জানা লাগবেই। মোবাইলের চার্জ অনেক আগেই শেষ।

আজকের ঘটনা ভিন্ন। আজকে নীল এর হাতে অফুরন্ত সময় এবং তার একটুও টেনশান হচ্ছে না। অনেকক্ষন আটকে রাখা দীর্ঘঃস্বাস ছেড়ে দিলে যেরকম আনন্দ হয়, সেরকম আনন্দ হচ্ছে নীল এর।

হাইওয়ে ৮৯ দিয়ে ফিরছিল ওরা। প্রতিদিনের মত আজকেও নীল এর কফি বানানো ও মিরিন এর ড্রাইভ করার পালা। বহুকাল আগে কবে জানি এই দৈনন্দিন দায়িত্ব ওরা ভাগ করে নিয়েছিল। দুইজনেই দেরি করে ফিরে কাজ থেকে। মিরিন এর কাজ শেষ হয় আগে, ও অফিসে ওভারটাইম করে নীল কে তার অফিস থেকে পিক করে নিয়ে বাসায় ফিরতো। অন্তত নীল তাই জানতো, অল্প কিছুদিন আগ পর্যন্ত।

কোন কোন দিন রকি বিচের ধারে গাড়ী পার্ক করে কিছুক্ষণ বিরতী নিত ওরা। ওদের দুইজনের একটি সিক্রেট হাইড আউট আছে যেখানে গাড়ী পার্ক করলে হাইওয়ে থেকে কিছু দেখা যায় না। আজকেও সেই বিশেষ জায়গায় গাড়ী টি পার্ক করা। মূলত এ কারণেই প্যাট্রল কার ওদেরকে দেখতে পায়নি।

ড্রাইভ ইন মুভির মত ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ীতে বসে আড্ডা দিয়েছে ওরা অনেকবার।  সমুদ্রতট এর চেয়ে চিত্তাকর্ষক সিনেমা আর কি হতে পারে? শুক্রবার রাতে সবাই যখন বিভিন্ন ক্লাবে কিংবা আনন্দ ফূর্তির জায়গায় সময় কাটাচ্ছে, ওরা দুইজন তখন তাদের এই লুকানো জায়গায় মেতে উঠতো আদিম ভালবাসায়। কোন এক রাতে বাজি তে হেরে দু'জন দু'জন কে তাড়া করেছিল বীচের এক মাথা থেকে আরেক মাথায়। গাড়ী তে ফিরে, ছেড়ে যাওয়া কাপড় পড়ে, থার্মোস থেকে দুই কাপ কফি খাওয়ার পরেও অনেকক্ষন কমেনি মিরিন এর ঠকঠকানি।

আজকেও থার্মোস এ কফি ছিল, কিন্তু নিজে খায় নি ও। মিরিন কে খেতে দিয়েছে। নীল জানে আজকে ও ওর জীবনের সেরা কফিটি বানাতে পেরেছে।

(চলবে)

Friday, March 16, 2018

মাইলস, পাইলস নহে!

আমি জীবনের প্রথম আট বছর কাটিয়েছি বিদেশে। এরপর এক বছর কাটিয়েছি ইউনিভার্সিটি স্টাফ কোয়ার্টারে। তারপর থেকে খিলগাঁয়ে আছি। আমার খুব বেশি বন্ধু ছিল না। ক্লাস ফোরে ভর্তি হয়েছিলাম খিলগাঁও সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে। আসতে আসতে এক দু'জন করে করে কলেজ জীবনের শেষে ছয় জন খুব ভাল বন্ধু জুটেছিল আমার কপালে; সবাই আশে পাশেই থাকে--খিলগাও কিংবা রামপুরা। 

বন্ধুদের মধ্যে একজন ছিল অনেক লম্বা; আমার চেয়েও ২-৩ ইঞ্চি লম্বা হবে। ওকে সবাই বিভিন্ন নিক নেইমে ডাকতো, তবে তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয়তা পেয়েছিল "লম্বু অমুক"। তো সেই লম্বু অমুক এর প্রিয় ব্যান্ড ছিল মাইলস। ঘটনাচক্রে, আমরা সবাই কম বেশি মাইলস এর গানগুলো পছন্দ করলেও লম্বু কে পচানোর সুযোগ কেউ ছাড়তো না। 

ওকে খেপানোর কিছু কমন লাইন ছিল। 

"আরে তোর পছন্দ তো দুই টাকলার ব্যান্ড। দেখবি এদের গান শুনতে শুনতে কোন দিন তোর ও মাথার চুল পড়ে যাবে"
"মাইলস এর গান শুনতে শুনতে পাইলস হয়ে গেল"
"পাইলস রুগী দের চিকিৎসার এক নাম্বার ঔষধ হইল গিয়া মাইলস এর চাঁদ তারা সূর্য্য"

আমার অতীব সেন্সিটিভ বন্ধুটি অসাধারণ প্রতিভাধর ছিল, কিন্তু তার কাছে এইসব পচানো লাইনের জন্য কোন কাম ব্যাক ছিল না। আমাদের পচানি খেতে খেতে একদিন বন্ধু পাড়ী জমালো বিদেশে; উচ্চ শিক্ষার্থে। দেশে আসে বছর দুই বছর পর, ১৫-২০ দিন থাকে, তাও ১-২ বারের বেশি দেখা হয় না। 

ওর প্রিয় ব্যান্ড এর একটি গান আজকে সাহস করে গেয়ে ফেললাম। 

আমি বাংলা গান গাওয়ার সাহস পাই না। অনেক কঠিন। আসলেও। লজ্জাজনক, কিন্তু ইহাই সত্য। তারপরেও প্রিয় ৯৬-৯৮ এর "কলিজা খাওয়া" বন্ধুদের অনুরোধ তো আর ফেলতে পারি না। জেমস চেষ্টা করসিলাম। গানের মাঝপথে কবি নজরুল এর "হাহাহা পায়রে হাসি" গাওয়া শুরু করাতে সেই প্রয়াস পন্ড হয়েছে।

গালি/সমালোচণ কে দুই হাত প্রসারিত করে গ্রহণ করা হবে। প্রশংসা কে নিয়ে হাস্যরস করা হবে। শুভ শুক্রবার।

পুনশ্চঃ "ট্যাগ এর আনন্দই বড় আনন্দ" - রবি ট্যাগোর

https://soundcloud.com/user-967850025/firiye-dao-miles-vover

Tuesday, March 13, 2018

If I Can Make it Here, I can make it Anywhere

[আজকে গল্প পোস্ট করার জন্য সেরা দিন নয়, কিন্তু মন টা অনেক খারাপ, লেখালেখি করেই সেই মন খারাপ ভাব দূর করার চেষ্টা। বেশ কিছুদিন আগে লিখে রাখা ড্রাফট শেষ করলাম আজ। আশা করি ভাল লাগবে।]

If I Can Make it Here, I Can Make it Anywhere

আজ নতুন করে শুরু করবো সব কিছু।

ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা বলেছিলেন যদি "যদি নিউইয়র্কে কিছু হতে পার, দুনিয়ার যেকোন জায়গায় হতে পারবে"

গুনগুন করে ক্লাসিক গান টার সুর ভাঁজতে ভাঁজতে এগিয়ে গেলাম জানালার দিকে।আজকের সূর্য্য টা অন্যদিনের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। মোবাইলের এপ এ দেখলাম তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রির মধ্যে থাকবে।

কাঠ ফাটা রোদের মধ্যে বের হলাম হাফ প্যান্ট, হাওয়াই শার্ট আর ফেডোরা হ্যাট চাপিয়ে। খুবই বিচিত্র পোষাক, নিঃসন্দেহে। কিন্তু মন আজ ফুরফুরা আর পকেট ডলারে ভর্তি।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। বাদ সাধলেন সুয্যি মামা। ডিউটির মাঝে ফাঁকি মেরেছেন উনি। উনার নির্দয় অনুপস্থিতিতে বেরসিক মেঘ এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল সর্বাংগ, মূহুর্তের মধ্যেই।

এতই বিরক্ত হলাম যে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে মেঘের দিকে তর্জনী উচা করে কিছুক্ষণ সূর্য্য কে অভিসম্পাত করলাম। এর পর হঠাত আনমনা হয়ে গেলাম।

ওয়াও নিউ ইয়র্ক! কে জানতো এত দ্রুত আমার ভাগ্য ফিরবে। ছোট একটা ব্যবসায় কিছু টাকা লগ্নী করেছিলাম। এক মাসের মাথায় সে টাকা ১০ গুণ হয়ে ফিরে এল। পরের মাসে ইনভেস্টমেন্ট দ্বিগুণ করে দিলাম। আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। "ডার্টি নিগার" রা ড্রাগ খেয়ে খেয়ে, নিজেরা মারামারি করে মরুক, আমার কি?

প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগতো। লিটন ছিল আমার প্রিয় বন্ধু, নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করতো আমাকে। এমন কি, আমি যেদিন "হেলথ চেক আপ" এর জন্য "মালয়েশিয়া" যাওয়ার কথা বলে প্লেনে উঠে গেলাম, সেদিনও কিছু সন্দেহ করে নাই সে। ড্রপ করে দিয়ে গিয়েছে এয়ারপোর্টে তার জীর্ণ টয়োটা স্টারলেট গাড়ীতে চড়িয়ে। বাবা মা কে কোনদিন চেনার সুযোগ হয় নি, আত্নীয়, বন্ধু, বেস্ট ফ্রেন্ড--সব কিছুই ছিল লিটন।

নিউ ইয়র্কে এসে মেরে দেয়া ৮০ লাখ টাকা ওড়াতে খুব বেশি সময় লাগে নাই। একবারও মনে পড়ে নাই লিটনের কথা। ৭ দিনের লাস ভেগাস ট্রিপ প্রায় নিঃশেষিত করে দিল আমাকে, সব দিক দিয়ে।

এরপরই বাকি টাকা দিয়ে ড্রাগ ব্যবসায় নামলাম। নিগ্রো দের প্রিয় কোকেইনের ব্যবসা, পুরাটাই লাভ। ওরা খেয়ে খেয়ে মরুক, তাতে আমার কি? এই ভেবে নিজেকে সান্তনা দিতাম। লিটনের শেয়ার বাজারের উদ্ভট ব্যবসার চেয়ে অনেক ভাল।

আচ্ছা, লিটন কেমন আছে? ও কি ভেবেছে যখন জানতে পেরেছে ওর প্রিয় বন্ধু তার সারা জীবনের সব সঞ্চয় মেরে দিয়ে ভেগে গিয়েছে? কাউকে কি বলতে পেরেছে দুঃখের কথা? নাকি দুঃখে হার্ট এটাকই করে বসলো সে! নাহ, আর ভাবতে চাই না।

আর দেরী নয়। নতুন দিন অপেক্ষা করছে, এভাবে আর রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না। সামনে আগাতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম জোরে।

মাটিতে পড়ে আছে নিউইয়র্ক টাইমস এর একটি কপি। হাতে নিলাম পেপার।

বিস্ফোরিত চোখে দেখলাম একজন মাঝারী আকারের মানুষের ছবি। পরনে হাফ প্যান্ট, নীল হলুদ হাওয়াই শার্ট। আর যেখানে মাথা থাকার কথা, সেখানে থেতলানো, ছিন্ন ভিন্ন মাংশপিন্ড। পাশে আশ্চর্যজনক ভাবে পড়ে আছে একটি অক্ষত ফেডোরা হ্যাট; একদম ইন্ডিয়ানা জোন্স এর টুপিটার মত।

হঠাত মনে পড়ে গেল কিছু দৃশ্য। আকাশের দিকে তর্জনী উত্তোলন। অনেক মানুষের আর্তচিতকার। কর্কশ হর্ণের শব্দ। হলুদ, চোখ ধাধানো আলো। তারপর আর তেমন কিছু মনে নেই।

এই স্বপ্নটা প্রতিদিনই দেখি আমি। মনে হয় আজকেই সেই দিন, যেদিন সব কিছু বদলে দিব। কিন্তু কিছু করতে পারি না, বলতেও পারি না।

নিউইয়র্কে না, দুনিয়ার কোন খানেই আর কোনদিন, কোনকিছু হতে পারবো না আমি। এই বয়ামের ঢাকনাও আর খুলবে না, যেখানে আমার মস্তিষ্ক সংরক্ষিত আছে অজানা কোন এক তরলে ডুবন্ত অবস্থায়।

আমাকে ক্ষমা করে দিস লিটন।

#ishtiaq_radical