Sunday, September 23, 2018

Passionate Fashionista

প্যাশনেট ফ্যাশনিস্তা
বেশ কিছুদিন ধরে জিহান তার রুম থেকে কম বের হয়। দিনে তিনবার নিয়ম করে বুয়া ট্রে ভর্তি খাবার দিয়ে যায়। আমেনা বুয়া অনেক বছর ধরেই ওদের বাসায় আছে। সম্ভবত তার মা যখন ছোট ছিল, তখন সে এসেছিল এ বাসায়। দুপুরের খাবার দেয়ার সময় আমেনা মাথা নাড়তে নাড়তে চলে গেল। ট্রে যেরকম ছিল, সেরকমই আছে, এক দানা খাবারও খায়নি মেয়েটা।

হঠাত করেই সায়েম সাহেব চলে গেলেন হার্ট এটাক করে । বয়স ছিল মাত্র ৪৩। সেই শোক সহ্য করতে না পেরে মাস দুয়েক পরে ছাদ থেকে লাফ দিয়ে জিহান এর মাও তার পাশের কবরে নিজের জায়গা নিয়ে নেন। একমাত্র মেয়ে জিহান হঠাত করে সম্পূর্ণ এতিম হয়ে গেল মাত্র ১৬ বছর বয়সে।

ম্যানেজার জলিল সাহেব খুব সৎ। তিনিই একক হাতে সায়েম সাহেব এর ব্যবসা চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। এইচ আর মারফত বেতনের যে টাকাটা আসে, তার থেকে এক পয়সাও বেশি নেন না। প্রতিদিন একবার আসেন বাচ্চা মেয়েটার খবর নিতে। বেশির ভাগ সময় তাকে জানানো হয় "আফা ঘুমায়"। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার অফিসের দিকে রউনা দেন।

উনিও পুরনো লোক। সায়েম সাহেব এর পিতা কাইউম সাহেব তাকে চাকরী দেন তার ফ্যাক্টরি তে প্রায় ২০ বছর আগে। জিহান কে ছোটবেলা থেকে দেখে আসছেন, নিজের সন্তানের মতই তাকে ভালবাসেন তিনি। উনি নিজের জীবনের মিশন হিসেবে নিয়েছেন জিহান এর দেখা শোনা করাকে। অন্তত মেয়েটা যেন কখনো টাকা পয়সার অভাবে না পড়ে, সেটা দেখা তার পবিত্র দায়িত্ব বলেই তিনি মনে করেন।

জোরে জোরে আইফোনের রিংটোন বাজছে। জিহান ফোন হাতে নিতে নিতেই কল কেটে গেল। আধা ঘুম আধা জাগা অবস্থায় বুকের উপর ফেলে রাখা বং টা সরিয়ে ফোন আনলক করলো ও। ৪৩ টা মিস কল! ঘরের মধ্যে ক্রিস্টাল মেথ এর উগ্র গন্ধ। অনেক কষ্টে জোগাড় করেছে ও ব্লু মেথ, যা কিনা এতদিন শুধু টিভি সিরিজেই দেখে এসেছে। সেরকম এক নেশায় আছে ও গত ৭২ ঘন্টা। খুধা তৃষ্ণা কোন কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না এক্টুও। মাম্মা আর ড্যাডির কথাও একবারও মনে পড়ছে না।

কল লিস্ট চেক করে অবাক হল সে। ও নিজেই ২০-৩০ টা কল করেছে। কাকে কল করলো এ আশংকায় আশংকিত হবার আগেই বুঝলো যে ও আসলে ড্যাড কেই কল করে যাচ্ছিল, আর প্রতিবার ড্যাড এর ভয়েস মেইলে যাচ্ছিল কলগুলো। আধা নেশা আধা সচেতন অবস্থায় আবার কল দিল ও ড্যাড কেঃ

"আমি সায়েম রহমান বলছি। যদি আপনি কোন কিছু বিক্রি করার জন ফোন করে থাকেন, তাহলে মুড়ি খান। আর যদি আপনি আমার পরিচিত কেউ হন, তাহলে আপনি জানবেন আমাকে কখন ফোন করলে পাওয়া যাবে। ধন্যবাদ"।

হায়! এত পরিচিত হয়েও ড্যাড কে আর কখনোই ফোন করে পাব না, ভাবতে ভাবতে চোখ ঝাপসা হয়ে এল জিহান এর। আবার ডায়াল করলো একই নাম্বারে, শুধু বাবার গলা আবার শোনার জন্য।

মা একদম পছন্দ করতো না ওর মডেলিং এর নেশা, কিন্ত ড্যাড খুব উৎসাহ দিত। প্রথম যেদিন র‍্যাম্প মডেলিং করে সবার মন জয় করে নিয়েছিল ও, তখন সবচেয়ে জোরে তালি দিয়েছিল ওর বাবা। মা রাগ করে আসেইনি দেখতে। নিজেও মডেল ছিলেন জিশান। তিনি চেয়েছিলেন মেয়ে হয় ফ্যাশান ডিজাইনার নইলে আর্কিটেক্ট হবে। মডেলিং এ আসবে তা কখনোই চাইতেন না।

এসব ভাবতে ভাবতে মিসড কল এর লিস্ট এ চোখ গেল জিহান এর। চম্পা খালা ফোন দিয়েছে ২০ বার। হঠাত মনে পড়ে গেল সব। আজ বিকেলেই তার একটা ফটোশুট আছে। চম্পা খালা তার হেয়ার ড্রেসার ও ফ্যাশান কন্সালটেন্ট, প্রতিবার মডেলিং এসাইনমেন্ট এর আগে অন্তত একবার হলেও চম্পা খালার কাছে ওর যেতেই হবে। ও যা করে সেটা হচ্ছে কাজ কনফার্ম হলে সেই দিন তারিখ খালাকে জানিয়ে রাখে, আর খালা সময়মত তাকে ফোন করে মনে করিয়ে দেয়।

কল লিস্ট ভাল করে খেয়াল করে দেখলো যে ১৮ টা কলই পুরনো; আজকে মাত্র দুইবার ফোন দিয়েছে খালা। চম্পা খালা আর তার মা সমসাময়িক ছিলেন । দুইজনের বয়স কাছাকাছি, এবং দুইজনেরই একসাথে মডেলিং ইন্ডাস্ট্রিতে উত্থান ও পতন। বিয়ের পর পরই মডেলিং ছেড়ে দেন মা।

জিহান এর সব মডেল বন্ধুরা আরো কম বয়সী ও আধুনিক ফ্যাশনিস্তা দের কাছে যায়, চম্পা খালার মত পুরনোরা তাদের কাছে বাতিল। উনার কাছে যাওয়া নিয়ে তাকে কম টিপ্পনী সহ্য করতে হয়নি। খালাকে জিহান এর বন্ধুর মতই লাগে। খালা তার মুখের দিকে তাকিয়েই বলতে পারেন কি চলছে। তা সে পিম্পলের যন্ত্রণাই হোক, আর বয়ফ্রেন্ড এর সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েনই হোক।

মা বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে ড্রাগস এর উপরেই আছে ও। বন্ধুরা এক এক করে সরে পড়েছে। মডেলিং এজেন্সী থেকেও কল আসা কমতে কমতে শুন্যের কোঠায়। পড়াশোনা আরো আগেই লাটে উঠেছে। শুধু খালার সাথেই মাঝে মাঝে কথা হয়। এসব ভাবতে ভাবতে ও ঘর থেকে বের হয়ে এল। ডুপ্লেক্স বাসার নিচতলায় সার্ভেন্টস কোয়ার্টার, ডাইনিং আর লিভিং রুম। উপরে সবার বেডরুম।

নিচে এসে খুব অবাক হয়ে জিহান দেখলো সোফায় চম্পা খালা বসে আছে। জিহান কে দেখে বলে উঠলেন "এতক্ষনে আসার সময় হল?"
জিহান প্রত্যুত্তরে বল্লো "আরে তুমি এসেছ আমাকে তো কেউ জানায়নি! একটু আগে আমেনা বুয়া আমার রুমে এসেছিল, সেও তো কিছু বলে নাই।"
"কি জানি! ও হয়তো আমাকে খেয়াল করে নাই" বলে জিহান এর দিকে তাকিয়ে একটা হাসি দিল ও।
"শুন, আজকে না তোর মডেলিং শুট? আয় তোর চুল ঠিক করে দেই"
"চল তাইলে তোমার স্টুডিও তে"
"স্টুডিওতে যাওয়া লাগবে না, এখানেই সাজিয়ে দিচ্ছি"
পরের এক ঘন্টা কোন দিক দিয়ে গেল জিহান টেরই পেল না। চম্পা খালার হাতে যেন যাদু। আয়নার দিকে তাকিয়ে নিজেকে চিনতেই পারলো না জিহান। দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো খালাকে।
"অনেক ধন্যবাদ তোমাকে খালা। You are the best"
"আরে ধুর পাগলী, এ আর এমন কি"
"শুন, তোর সাথে খুব জরুরী কথা আছে"
"কি?"
"আমি আর তোর হেয়ার স্টাইলিস্ট থাকতে চাই না। তুই এর পর থেকে তপন এর কাছে যাবি"
"এহ, ছি! ওই চ্যাংড়া ছেলের কাছে আমি কেন যাব?"
"না, আমি ছুটি চাই। আর কাজই করবো না। আর তোরও সময় এসেছে নতুন নতুন স্টাইল জানার আর শেখার"
এ কথা শুনেই জিহান এর দু'চোখ ছলছল করতে লাগলো। কিছু বলতে যাওয়ার আগেই তাকে থামিয়ে দিল চম্পা।
"শুন, ইমো হইস না। আমি আমার বাবার কাছে চলে যাব। তুই ভাল থাকিস। আমার হাত ধরে প্রতিজ্ঞা কর, নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিবি। ড্রাগস ছেড়ে দিবি। পড়ালেখা করে অনেক বড় হবি, যাতে আমি গর্ব করে বলতে পারি এই মেয়েটা আমাকে খালা ডাকতো, কিন্তু আমরা বন্ধুর মত ছিলাম"।

জিহান বুঝলো না এত কথা কেন বলছে খালা। এর মধ্যেই খালা বিদায় নিয়ে চলে গেল, আর জিহান তাড়াতাড়ি বের হয়ে ড্রাইভার কে ডাক দিল। ঘর থেকে বের হতে হতে খেয়াল করলো আমেনা বুয়া ঘুমাচ্ছে এক কোণায়।

সেদিনের মডেলিং শুট খুব ভাল হল। সবাই অনেক প্রসংশা করলো। নতুন একটা প্রোডাক্ট এর লঞ্চিং অনুষ্ঠান ছিল। ইন্ডাস্ট্রির অনেকেই এসেছিল। অনুষ্ঠানের শেষে ককটেল পার্টি। সবার হাতে চকচকে গ্লাস। জিহান ও এক গ্লাস শেম্পেইন নিল।

খেয়াল করলো ও, দূর থেকে লম্বা, হ্যান্ডসাম ধরণের একটা ছেলে তার দিকে তাকিয়ে হাসছে। কাছে এগিয়ে গিয়ে হ্যান্ডশেক করলো জিহান।

"কি, তপনদা, কেমন হল আমার আজকের পারফরম্যান্স?"
"অসাধারন! সম্ভবত তোমার ক্যারিয়ার এর সেরা কাজ।
যাহ! কি যে বলেন না!
না আসলেই। বিশেষ করে তোমার হেয়ার স্টাইল। আজকে একদম অন্যরকম লাগছে।
হ্যা, মাত্রই চম্পা খালার কাছ থেকে সেজে আসলাম। উনি আমার বাসায় এসে আমাকে সাজিয়ে দিয়ে গিয়েছেন।
চম্পা মানে চম্পা ফার্নান্দেজ? সেই এংলো মহিলা?
হ্যা, উনিই তো আমার হেয়ার স্টাইলিস্ট!"

তপন তার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। জিহান বলেই যাচ্ছে "খালা রিটায়ার করবে বলেছে। এরপর থেকে আপনার কাছে যেতে বলেছে। আপনার শিডিউল কবে ফ্রি বলবেন? চম্পা খালা বলেছে তার বাবার কাছে থাকবে এখন থেকে"।
"তুমি মনে হয় একটু বেশি পান করে ফেলেছ।বাসায় চলে যাও" -- একটু রূঢ় ভাবেই বল্লো তপন।

জিহান কিছু বোঝার আগেই হনহন করে হেটে তপন চলে গেল সামনে থেকে। কিছুক্ষণ পরে বের হয়ে গেল জিহান।ফোর পয়েন্টস হোটেল থেকে বেরিয়ে ড্রাইভার কে ফোন দিল। ড্রাইভার জানালো রাস্তার অপর পাশে নিউজ পেপার স্ট্যান্ড এর সামনে গাড়ী রেখেছে।

ড্রাইভার কে কিছু বাছা বাছা গালি দিতে দিতে রাস্তা পেরুলো জিহান। পেপার স্ট্যান্ড এর সামনে এসে গাড়ীতে উঠলো।রাস্তায় প্রচন্ড জ্যাম।বসে বসে বোরড হতে হতে কি মনে করে যেন ডিএক্টিভেট করা ফেসবুক আইডি আবার চালু করলো ও। ২০০-৩০০ নোটিফিকেশান, ৫০০ মেসেজ ও অসংখ্য ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট কে পাত্তা না দিয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ও টাইপ করলো "চম্পা ফার্নান্দেজ"

হোম পেজে গিয়েই দেখলো "Remembering Champa Fernandez".
৩ মাস আগের ডেট। ছোট একটা আপডেট।
"আমাদের প্রিয় চম্পা আপা আজ সবাইকে ছেড়ে না ফেরার দেশে চলে গিয়েছেন। তার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী তাকে তার প্রয়াত পিতার পাশে কবর দেয়া হয়েছে।"

মুখে মেকাপ, চোখে আই শ্যাডো, চুলে সুন্দর করে খোপা করা, পেডিকিউর মেনিকিউর করা হাত ও পা। ভয়ে আতংকে অসাড় হয়ে আসতে লাগলো ওর সকল বোধ বুদ্ধি। ড্রাইভার কিছু বোঝার আগেই গাড়ীর দরজা খুলে বের হয়ে গেল জিহান। চৌরাস্তার মাঝখান থেকে চম্পা খালা আর ওর বাবা মাকে দেখতে পেল। তিনজনই হাতছানি দিয়ে ডাকছে ওকে, সবার পরনে সাদা পোশাক। চোখে মুখে প্রশান্তির ছাপ, কিন্তু আবার কেমন যেন একটা বেদনাও ফুটে উঠেছে।

ওদের দিকে এক অমোঘ আকর্ষণে এগিয়ে গেল জিহান। ঠিক সেই মূহুর্তে এক বেপরোয়া পাঠাও বাইক রাইডার ধেয়ে আসছিল রাস্তার ওপর দিক থেকে ...
(শেষ)

Sunday, July 22, 2018

Love the Blues

আমাদের সবার প্রিয় শিল্পী জেমস এর একটি গান আছে, যার নাম "গিটার কাঁদতে জানে"। বাস্তবিকই, গিটার কাঁদতে জানে, এবং পারে শ্রোতাদের কাঁদাতে। হ্যা, আমি ব্লুজ সংগীত এর কথা বলছি। 

আমি মোটামুটি ছোটবেলা থেকেই গান শুনে আসছি। শুরু করেছিলাম বনি এম, এবা দিয়ে। সেখান থেকে হেভি মেটাল, হার্ড রক, পপ, ক্লাসিক রক পার হয়ে তারপর সাইকাডেলিক রক, প্রগ্রেসিভ রক, ডেথ মেটাল এসবে গিয়ে একটা ব্রেক নেই। হঠাত ব্লুজ আর জ্যাজ ভাল লাগা শুরু করে। 

প্রথম যখন গ্যারি মুর এর "স্টিল গট দ্যা ব্লুজ" শুনেছিলাম, তখনো অনুধাবন করতে পারিনি ব্লুজ এর শক্তি। বি বি কিং শোনার পর থেকে জীবন পালটে যায়। মেটালিকা মেগাডেথ স্যাভাটাজ মরবিড এঞ্জেল এর শ্রোতা একজন থ্রিল ইজ গন শুনে চোখের পানি মুছে--এই দৃশ্য আমি আমার অবাস্তবতম স্বপ্নেও ভাবিনি! ২০১৫ সালে যখন বি বি কিং মারা যান, আমি সারাদিন নিস্তব্ধ ছিলাম। আমার জীবদ্দশায় বেশ কিছু প্রিয় শিল্পী পরলোক গমন করেন, কিন্তু বয়স বাড়ার সাথে সাথে এ ব্যাপারগুলোর সাথে নিজেকে মানিয়ে নেয়া কঠিনতর হয়ে যাচ্ছে। 

আসলে ব্লুজ বলতে কি বোঝায়, তা কাউকে লিখে, কিংবা বলে বলে বোঝানো কঠিন। যদি আপনি যথেষ্ঠ পরিমাণে ব্লুজ শুনেন, তাহলে বুঝতে পারবেন উহা কি বস্তু। আমি এইটুকু বুঝি যে প্রতিটি ব্লুজ গানের মাঝে লুকিয়ে আছে "ব্লু", অর্থাৎ বেদনা। বেদনার রঙ নীল, এটি কে না জানে?  

হালের জনপ্রিয় নেটফ্লিক্স সিরিজ "লিউক কেইজ"। কাহিনীর উপজীব্য হচ্ছে একজন বুলেটপ্রুফ হিরো লিউক, যে কিনা কালো অধ্যুষিত হার্লেম অঞ্চলে থাকে। এই সিরিজটি ব্লুজ ভক্তদের জন্য খুব আনন্দদায়ক। কৃশকায়, বিশালদেহী নায়ক যখন ভিলেনদের কিলিয়ে ভর্তা বানায়, তখন ব্যাকগ্রাউন্ডে ব্লুজ বাজতে থাকে। এ এক অসাধারণ অভিজ্ঞতা। যাই হোক, এই লেখা শেষ করবো আমার প্রিয়, এবং সম্ভবত সবচেয়ে বিখ্যাত ব্লুজ একক এর লিংক দিয়েঃ

https://youtu.be/4fk2prKnYnI


Thursday, July 19, 2018

২৪ ঘন্টা

২৪ ঘন্টা

আজকে দিনটি অন্যরকম ছিল সব দিক দিয়েই। সকালে এলার্ম এর শব্দটা কেন জানি শুনিনি। অনেকদিন ধরেই সকালে ঘুম থেকে ওঠার প্রয়োজনীয়তাটি নেই, কিন্তু তারপরেও কেন জানি মোবাইলের ৬ঃ৩০র এলার্ম টা বন্ধ করা হয়নি।

যখন ঘুম ভাংলো, তখন বাইরে ঝকঝকে রোদ, ঘড়িতে বাজে ৯ টা। "আম্মা নাস্তা দাও" বলতে গিয়েও বলতে পারলো না তানভির, কথা গুলো মুখের কাছে এসে আটলে গেল। মনে পড়লো, এই ডাকে সাড়া দেয়ার মানুষটি চলে গিয়েছে না ফেরার দেশে আরো তিন হাজার ছয়শো ষাতষট্টি দিন আগে।

তবে অন্যদিনের মত মন খারাপ হল না, কারণ আজ আর ঘুম থেকে উঠে ঘন্টা দুয়েক অপেক্ষা করা লাগছে না, পাশের রেস্তোরাঁ থেকে প্লেটে করে নাস্তা দিয়ে গিয়েছে আরও আধ ঘন্টা আগেই। রশিদ মিয়া কে বলা আছে, সে জানালা দিয়ে কিভাবে জানি প্লেট টা ঢুকিয়ে টেবিলে রেখে দেয়।

আজ মেনুতে পরটা ভাজি। ভাজি খেতে খেতে হঠাত আবিষ্কার করলো ভেতরে লুকিয়ে আছে ২/৩ টূকরো কলিজা গুর্দা। ও যারপরনাই বিস্মিত হল, কিন্তু সে ব্যাপারটাকে খুব স্বাভাবিক ধরে নিয়েই খেয়ে নিল। এই কলিজার জন্য বাড়তি কোন বিল দিতে হবে না ওর, কারণ সে জানে এটি তার প্রতি রেস্তোরাঁ মালিক কলিমুদ্দিন এর ব্যখাতিত স্নেহের বহিঃপ্রকাশ। তবে এর আগে অল্প স্বল্প মাংসের হাড্ডি আর ঝোল পেলেও আস্ত কলিজার টুকরা এই প্রথম।

খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে গিয়ে কল থেকেই পানি পেল তানভির। এ আরেক বিস্ময়! এ সময়ে কলে পানি থাকে না বললেই চলে, প্রতিদিন বালতি থেকে জমানো পানি মগ দিয়ে তুলে তুলে প্রাতকৃত্য সারতে হয় তাকে। আজকে সেই ঝামেলা পোহাতে হল না একদমই।

আলনায় ঝোলানো শার্টখানা দেখে একটু অবাক হল সে।

"আরে এই শার্ট কোত্থেকে আসলো?"

কয়দিন আগে আব্বার পুরনো জিনিসপত্র ঘাটতে গিয়ে এই শার্টটি পেয়েছিল ও। হালকা সবুজ রঙ এর শার্টখানা দেখেই মনে পড়ে গেল সেই দিনের কথা। আম্মা সেদিন এই শার্ট টা বের করে রেখেছিল আব্বার জন্য। নাইট শিফটের ডিউটিতে যাওয়ার সময় এটা পড়বে। কোন এক বিচিত্র কারণে আব্বার মেজাজ সেদিন খুব বিক্ষিপ্ত ছিল। কথা কথায় রেগে যাচ্ছিল। সবুজ শার্ট দেখেই তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো, আর মায়ের সাথে চরম রাগারাগি করে কালো শার্ট খানা গায়ে চড়িয়ে হনহন করে বেরিয়ে গেল বাসা থেকে।

শার্ট হাতে নিয়ে পুরো দৃশ্যটা তার চোখে ভেসে উঠলো, যেন গতকালের ঘটনা। তখন তার বয়স ছিল ১১। সেই রাতে মদ্যপ ট্রাক ড্রাইভার কালো শার্ট পরা হাসিখুশি, আত্নভোলা মানুষটাকে দেখতে পায়নি। চার চাকার দানবটাকে আব্বার অপুষ্টিতে ভোগা রোগা শরীরের উপর দিয়ে স্টিম রোলারের মত চালিয়ে নিয়ে চলে গিয়েছে। কাজটা স্টিম রোলারের মত হলেও ট্রাকের স্পিড ছিল বৈদ্যুতিক ট্রেন এর মত।

যাক, দুঃখের কথা মনে করে লাভ নাই। রঙচটা জিন্স এর সাথে সবুজ শার্ট পরে বাসা থেকে বের হল তানভির। হঠাত টের পেল, বুক পকেটটা কেমন ভারী ভারী লাগে। পকেটে হাত দিয়ে পাচশো টাকার চকচকে চারটি নোট পেল। এ যেন মেঘ না চাইতে জল!

নিজের ছিন্নবিচ্ছিন্ন মানিব্যাগ টা খুলে সযত্নে টাকাগুলো রেখে দিল সে। এ যেন স্বর্গ থেকে আশির্বাদ এর মত। ছেড়া ময়লা দুই আর পাঁচ টাকার নোটগুলোর পাশে চারটি চকচকে নোট একেবারেই মানালো না।

অনেকদিন পর জুলিয়া কে ফোন করলো তানভির। ফোন কানে রাখার প্রয়োজনবোধ করলো না সে। কখনোই সে এক রিং এ ফোন ধরে না। আরো সুষ্পষ্ট করে বলতে গেলে, প্রায় কখনোই ফোনটা ধরেনা সে। গত ছয় মাস ধরে এরকম চলছে।

শেষ দেখা হয়েছে কবে মনে পড়ছে না তানভির এর। তবে সে দেখা হওয়াটাও মজার ছিল। জুলিয়া ওকে দেখেই বলে উঠলোঃ

"একদিনও কি আমার আগে আসতে পারো না? কি নিয়ে তুমি এত ব্যস্ত?"

কৈফিয়ত দেয়ার আগেই থামিয়ে দিল ওকে জুলিয়া। মোবাইল এর কল লিস্ট বের করে দেখালো।

"দেখেছ কাকে কল করছি গত ২০ মিনিট ধরে?"
"হ্যাঁ, আমাকে। কিন্তু আমার নাম V. Tanvir নামে সেইভ করেছ কেন?"
"করেছি কারণ আমি আরেকটা তানভির কে চিনি। সে হচ্ছে তানভির, জাস্ট তানভির। আর তুমি হচ্ছ ভেদাইম্মা তানভির। তাই ভি তানভির নামে সেইভ করেছি"।

অন্যমনষ্ক অবস্থায় হঠাত খেয়াল করলো তানভির যে কল রিসিভ করেছে জুলিয়া, আর ৩০ সেকেন্ড চলেও গিয়েছে। তাড়াতাড়ি মোবাইল কানে দিল সে।

"কি ভাই, ফোন দিয়ে কথা বল না কেন? সমস্যা কি?
কিছু না। কখনো তো একবারে ধর না।
তাই বলে রিসিভার কানে রাখবে না?
আচ্ছা ক্ষমা চাই, ক্ষমা।
ক্ষমা চাইলে হবে না, খাওয়াতে হবে।
আমি রাজি। কোথায় খাবে?
তুমি তো জানই কই খেতে চাই।
ইয়ে মানে, ভেদাইম্মার সাথে লাঞ্চ করলে তোমার মান ইজ্জত যাবে না?
Dude, don't push your luck. Don't be late"

আমারি হোটেল এর রুফটপ। সন্ধ্যায় বেশি জমে। তবে আজ দুপুরেও খুব ভাল লাগলো।

প্রথম বারের মত বুকে সাহস নিয়ে বিল দিতে চাইলো তানভির, কিন্তু অন্য সব দিনের মত আজকেও ওর চকচকে নোটগুলো ইগ্নোর করে নিজের প্লাটিনাম কার্ডটি এগিয়ে দিল জুলিয়া।

"আমি আসলে তোমার কল ধরবো ভাবি নাই। হঠাত কি মনে হল, রিসিভ করলাম। এতদিন পর ফোন করলে?
ইয়ে না, মানে, ব্যস্ত থাকি অনেক।
আমি বলেছি না আমার কাছে ইনফেরিয়রিটি কমপ্লেক্স এর গল্প না করতে?
হুম। ওকে, মনে থাকবে!
এইসব বাদ দাও। আমাকে সময় দাও। অনেক কিছু বলতে ইচ্ছা করে। তোমার র‍্যান্ডম আচরণের কারনে বলতে পারি না।"

তানভির আর কিছু বল্ল না। নিস্তব্ধতা অনেক সময় অনেক কিছু অনেক ভাল ভাবে প্রকাশ করতে পারে।

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা। বাসায় ফেরার পালা। ওকে মহাখালী টিএন্ডটি কলোনীর মাঠের পাশে নামিয়ে দিয়ে চলে গেল জুলিয়া।একটু সামনেই ওদের বাসা।

গোধুলী বেলার এই সময়টা খুব তার খুব প্রিয়। মাঠে বাচ্চারা দাপাদাপি করে ফুটবল খেলছে। সবাইকে বাচ্চা বলাটা ঠিকও হচ্ছে না। কলেজ ভার্সিটি পড়ুয়া ছেলেরাও খেলছে। বেশ সুসংহত ভাবে খেলা হচ্ছে। দু'টি দলের আবার জার্সি ও আছে দেখা যায়। একজন তাগড়া ধরণের রেফারী ও দেখা যাচ্ছে।

সারাদিনের কথা চিন্তা করতে করতে হেটে যেতে লাগলো সে। এরকম সুপ্রসন্ন ভাগ্য ওর অনেকদিনের মাঝে আসেনি। চায়ের দোকানে তিনশো টাকা বাকি পড়ে গিয়েছে, আজ সেটাও শোধ করে দিবে ও।

হঠাত জোরালো বাশীর শব্দ শুনতে পেল তানভির। খেলা শেষ হল বোধহয়। এরকম লম্বা বাশী তো খেলা শেষ না হলে বাজানো হয় না। বাঁশী শুনতে শুনতে মন্ত্রমুগ্ধ তানভির খেয়াল করলো না ছুটে আসা প্রাইভেট কার এর বিকট হর্ণ ধ্বনী।

এরপর শুধু আধার আর আধার।এই সব না, সব কিছুই বাদ দিতে হল।

Friday, June 08, 2018

দেরী

রহমান সাহেব কাজ করছেন। নিবিড় মনে। অফিসে উনার সমসাময়িক প্রায় সবাই ল্যাপটপ পেলেও উনি এখনো কাজ করেন পুরনো ডেস্কটপ পিসিতে। অফিসের জ্যেষ্ঠতম নয় বলে শুধু, অনেক সততা এবং কর্মদক্ষতার কারণেই সবার শ্রদ্ধার পাত্র উনি। সকালে সবার আগে আসেন অফিসে, বের হন সবার শেষে। সব মিলিয়ে প্রায় ১২ ঘন্টার মত অফিস করেন উনি। বহুজাতিক এই প্রতিষ্ঠান্ সপ্তাহে দু'দিন বন্ধ থাকলেও প্রায় শনিবারেই উনি হাজির হয়ে যান পরের সপ্তাহের কাজ এগিয়ে রাখার জন্য।সপ্তাহে ৭২ ঘন্টা।

লাঞ্চ টা টিফিন কেরিয়ারে করে দিয়ে যায় "মায়ের হাতের খাবার" নামের ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে। খাবার আসে ঠিক দুপুর ১ টায় এবং উনি ১৫ মিনিটে খাওয়া শেষ করে নামাজে দাড়ান। নামাজ সেরেই আবার কম্পিউটার এর সামনে বসে যান, আর শুরু হয় কিবোর্ডের উপর খটাস খটাস শব্দ আর মাউস এর ক্লিক ক্লিক শব্দ। এক্সেল ফাইলে জমা হতে থাকে হাজার হাজার সংখ্যা আর হতে থাকে কোটি কোটি টাকার হিসাব।

প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি এই প্রতিষ্ঠানে কর্মরত আছেন, কেউ কোনদিন এই রুটিনের ব্যত্যয় দেখেনি।শুধু একবার এক ডেলিভারী বয় আসার পথে গাড়ী চাপা পড়েছিল দেখে সেদিনের খাবার আসেনি। রহমান সাহেব অগ্নি মূর্তির মত কিছুক্ষন ঘড়ির দিকে চেয়ে থেকে আবার কাজে ফিরে যান। পরের সপ্তাহ থেকে নতুন একটি ক্যাটারিং সার্ভিস থেকে খাবার আসা শুরু করে।

সেদিন ছিল খুব ঝামেলাপূর্ণ একটি দিন। সকাল থেকেই একটি হিসেব মেলানোর চেষ্টা করছিলেন রহমান সাহেন। প্রায় ২০ লাখ টাকার হিসেবে গড়মিল। দেখা যাচ্ছে এমডির সাক্ষরের মাধ্যমেই এই টাকা টা তোলা হয়েছে, কিন্তু সেটার স্বপক্ষে প্রমাণ স্বরুপ ওয়ার্ক অর্ডারটি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এবং মজার ব্যাপার হচ্ছে এমডির কাছে যাওয়ার আগে উনার নিজের নিজের হাত ধরেই যায় এই নির্দেশগুলো। তিনি সিস্টেমে দেখলেন যে তার এপ্রুভাল এর পরেই টাকাটা উত্তোলিত হয়েছে, কিন্তু সেটার নিয়মতান্ত্রিক কোন রেকর্ড নেই।

হঠাত ডেস্ক ফোনে কল এল। রিসিভ করেই এমডি জাহাংগীর সাহেব এর বাজখাই কন্ঠ শুনতে পেলেন তিনিঃ
"রহমান সাহেব, জলদী আমার রুমে আসেন"।

তারপরের ঘটনা আর স্পষ্ট মনে নেই। বয়সে ছোট হয়েও বস হয়ে যাওয়া জাহাংগীর সাহেব এর কাছে যখন একের পর এক বকা ও অভিসম্পাত শুনতে থাকলেন, তখন তার মনে হল চারপাশের দেয়াল থেকে পাথর খসে খসে পড়ছে মাথায়। একটা সময়ের পর আর কিছু শুনতে পেলেন না তিনি। আনমোনা হয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন কখন শেষ হবে এই অত্যাচার। হঠাত টের পেলেন তার ঘাড় ধরে ঝাকাচ্ছেন এমডি সাহেব।

"শুনেন, আপনি পুরনো কর্মচারী। লোকাল কোম্পানীতে কাজ নিয়েছিলেন, তখন কেউ এত খুঁটিনাটি হিসাব করতো না। কিন্তু বহুজাতিক হবার পর এখন আর আপনার মত ট্র্যাডিশনাল এমপ্লয়িদের উপর ভরসা করা যায় না। তাও আমরা আপনার উপর আস্থা রেখেছি এতকাল আগের দিনের কথা ভেবে। সামান্য কয়টা টাকার জন্য আপনি এরকম করবেন, এটা কষ্মিনকালেও ভাবিনি! আপনি হয় হিসেব টা মিলিয়ে দেন, অথবা টাকাগুলো ফেরত দিয়ে যান। আমার হাতে হাতে দিবেন, কেউ জানবে না কিছু। আপনি আপনার চাকরী ও রক্ষা করতে পারবেন, সম্মান ও অটুট থাকবে। আর যদি মনে করেন টাকা দিতে পারবেন না, তাহলে আর রবিবার থেকে আসার দরকার নেই অফিসে। আমরা বিভাগীয় তদন্ত করে আপনাকে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেব"।

বাকিটা সন্ধ্যা কাটলো ঘোরের মধ্যে। রহমান সাহেব নিজের ডেস্কে এসে মাথায় হাত দিয়ে বসে রইলেন। সেদিন ছিল সপ্তাহের শেষ দিন। একে একে কর্মচারীরা সবাই বিদায় নিল। ততক্ষণে অফিসে সবাই জেনে গিয়েছে কাহিনী। যাওয়ার পথে অনেকেই উনার দিকে কটাক্ষমূলক দৃষ্টি তে তাকালো, চল্ল কানাঘুষা, আর অল্প দুই একজন, বিশেষ করে যারা পুরনো, তারা কিঞ্চিত করুণার দৃষ্টিতেও দেখলেন উনাকে।

এক পর্যায়ে রহমান সাহেব এর মনে হল উনি পারবেন। চালু করলেন আবার কম্পিউটার। এক ফাইল থেকে আরেক ফাইলে উড়ে যেতে লাগলেন তিনি। উনার দৃঢ় বিশ্বাস কোথাও কোন ভুল হয়েছে। নাওয়া খাওয়া ভুলে কাজ করতে লাগলেন। চারপাশে নিভে যেতে লাগলো এক এক করে বাতি, উনার হুশ নেই।
"ইউরেকা! পেয়েছি এবার!"

ফাইল সার্ভারের এক কোণায় পড়ে থাকা একটি গোপন ফাইল খুঁজে পেলেন রহমান সাহেব। খুলতে গিয়ে দেখলেন পাসওয়ার্ড দেয়া। iamtheboss টাইপ করতেই খুলে গেল ফাইলটি। পড়তে পড়তে রহমান সাহেব এর মুখে ফুটে উঠলো অনাবিল হাসি।

"পেয়েছি এবার বেটাকে! আমার সাথে মামদোবাজি! এই জিনিস হেডকোয়ার্টারে পাঠালে তো তোরই চাকরী থাকবে না। অতি উতসাহের সাথে প্রিন্ট দিলেন উনি ফাইলটির গুরুত্ত্বপূর্ব অংশগুলোর। উদ্দেশ্য প্রিন্ট আউট নিয়ে আরেকবার নিশ্চিত হওয়া। সব ঠিক ঠাক থাকলে রাতেই উনি এই ফাইলগুলো রিজিওনাল হেড কে পাঠিয়ে দিবেন। বস কে সিসি তে রাখবেন কি না ভাবতে ভাবতে এগুলেন প্রিন্টার এর দিকে।

প্রিন্টার টা রুমের একদম শেষ মাথায়। হেটে যেতে যেতে খেয়াল করলেন পুরো অফিস গমগম করছে মানুষে। কাউকেই তেমন একটা চিনতে পারলেন না। বুঝে পেলেন না কোন দিক দিয়ে সকাল হয়েছে। কিন্তু...শুক্রবারে তো অফিসে এত লোক থাকে না। কেউ তাকে লক্ষ্যও করছে না। হঠাত মনে হল কে জানি উনার দেহের ভেতর দিয়ে চলে গেল। একটি উদ্ভিন যৌবনা নারী। কিন্তু উনি কোন সাড়া পেলেন না, মেয়েটাও একজন বৃদ্ধ ব্যক্তির সাথে ধাক্কা খাওয়া সূচক কোন আচরণ করলো না।

যেখানে প্রিন্টার থাকার কথা, সেখানে গিয়ে আবিষ্কার করলেন একটি উচু টেবিল রাখা, আর তার উপর একটি কালো রঙ এর অচেনা একটি মেশিন রাখা। সেখান থেকে প্লাস্টিকের কাপে ঢেলে ঢেলে কি জানি পান করছে ৩-৪ জন। উনি তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করলেন। বলে উঠলেনঃ

"এই যে ভাই, প্রিন্টার টা কোথায় সরিয়েছে বলেন তো? আমি খুব জরুরী কিছু ডকুমেন্ট প্রিন্ট দিয়েছি!"
কেউ তার কথা শুনতে পেল না। এবার প্রথম বারের মত তিনি উদ্বিগ্ন হলেন। সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে ফিরে গেলেন নিজের ডেস্কে। চেয়ারে বসতে গিয়ে হোচট খেলেন। উনার ডেস্কটির চারপাশে কর্ডন দেয়া। এক ফাঁক দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলেন উনার সেই চিরপরিচিত চেয়ারটি রয়েছে, এবং পিসিটিও রয়েছে অক্ষত। পাশে একটি ছোট কাগজে অনেক কিছু লেখা। উনার নেম প্লেট টিও আছে অক্ষত "এম এম রহমান, সিনিয়ার একাউন্টস অফিসার"। দড়ির নিচ দিয়ে ভেতরে গেলেন তিনি।

কাগজে লেখাঃ
"এম এম রহমান (জন্ম ২১/২/১৯৬২, মৃত্যু ১/৬/২০১৮)"
রহমান সাহেব ছিলেন একবিংস শতাব্দীতে এই কোম্পানীর একমাত্র ডেস্কটপ ইউজার। আমাদের অত্যন্ত সৎ এবং নিষ্ঠাবান, চিরকুমার এই মিষ্টভাষী কলিগটি কাজ করতে করতেই মৃত্যমুখে পতিত হন। ডাক্তারী পরীক্ষায় জানা যায় যে অতিরিক্ত কাজের চাপজনিত টেনশান থেকে উনার স্ট্রোক হয়, এবং তাতেই উনি মারা যান।

উনি মারা যাওয়ার পর বহুদিন পর্যন্ত এই ডেস্কে কেউ কাজ করতে পারেনি। সবাই বলতো তারা কিবোর্ড এর খটাশ খটাশ শব্দ শুনতে পাচ্ছিল সারাক্ষণ, আর কেউ কেউ প্রিন্ট হওয়া কিছু কাগজও দেখতে পায় ডেস্কের উপর ছড়ানো, কিন্তু কাগজ ধরতে গেলেই সেগুলো ভ্যানিশ হয়ে যেত।

আমরা একটি প্রগতিশীল বহুজাতিক সংগঠন হিসেবে আদিভৌতিক কোন ব্যাপার কে অবশ্যই প্রমোট করতে চাই না, তবে রহমান সাহেব এর প্রতি সম্মান প্রদর্শন পূর্বক এবং তাকে নিয়ে চালু ভুতের গল্প গুলোকে অফিসের গসিপ হিসেবে চিরস্থায়ী করার জন্য উনার ওয়ার্কস্পেস কে যাদুঘর এর মর্যাদা দেয়া হল।"

রহমান সাহেব এর পুরো দুনিয়া টলে উঠলো। লেখাগুলো আবার পড়লেন উনি। কোন রহমান এইটা? কি কাহিনী? একই নামে আরেকজন? আমি কি ভুল অফিসে?

হঠাত চোখ গেল ক্যালেন্ডারের পাতায়। সেদিনের তারিখ ২৫ ফেব্রুয়ারী, ২০৩০।
১২ বছর লাগলো বস এর চুরি ধরতে? একটু বেশিই দেরী হয়ে গেল মনে হয়।
মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন রহমান সাহেব। শরীরে কোন বোধ নেই।
(ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজতে লাগলো U2 band এর Stuck In a Moment গানটি। আস্তে আস্তে লিরিক্স শুনা যাচ্ছেঃ
You've got to get yourself together
You've got stuck in a moment
And now you can't get out of it
Don't say that later will be better
Now you're stuck in a moment
And you can't get out of it)

রহমান সাহেব এর মনে পড়ে গেল সব। উনার নিথর দেহ নিয়ে মর্গের ডাক্তার দের টানাটানি, নির্মম ছুরি প্রয়োগ, কবরে নামিয়ে দেয়ার সময়ের দুঃসহ স্মৃতি, লাশের চা এর কটু গন্ধ। মোনাজাত এর সময় বস এর মেকি কান্না, কয়েকজন কলিগের সত্যিকারের অশ্রু, আর তেমন কিছু না।

সারা জীবন কাজের পেছনে ছুটে গেলেন, কি পেলেন জীবনে? একটি মুহুর্তের মাঝেই আটকে রইলো জীবন টা।

Tuesday, May 22, 2018

Beirut Diary 7

বৈরুতে বনবাস - পর্ব ৭

বৈরুতে, তথা লেবাননে আমি সাকুল্যে ছিলাম ৬০ দিনের মত। এর মধ্যে ১৬টি উইকেন্ড এর পাশাপাশি আরও ৪ দিনের ঈদের ছুটি কাটিয়েছি। ২০ দিনের মধ্যে ভেবেছিলাম অন্তত ১০ দিন তো ভূমধ্যসাগর দেখতে যাওয়া হবেই। তবে দুঃখজনক হলেও সত্য, আমি যেখানে থাকতাম, সেখান থেকে সাগর পাড় বেশ খানিকটা দূরে ছিল, এবং আমি মাত্র দুই বার যেতে পেরেছিলাম।আজকে অবশ্য সে স্মৃতিচারণ করবো না।

বৈরুতে সপ্তাহ খানিক থাকার পর শিফট হলাম হোটেল থেকে একটি এপার্টমেন্টে। এই স্টুডিও এপার্টমেন্টটির সাথে হোটেল এর মূল পার্থক্য হচ্ছে সার্ভিস। হোটেল এর মত প্রতিদিনের রুম সার্ভিস নেই। অর্থাৎ, রুম ময়লা হলে সেটা দৈনিক ভিত্তিতে নিজেকেই ঠিক করে নিতে হবে।লজ্জাজনক হলেও স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমি এধরণের কাজের ক্ষেত্রে পুরোপুরি অরকর্মণ্য ছিলাম সেসময়। সুতরাং ঘর কিভাবে পরিষ্কার করবো সে চিন্তার থেকে কিভাবে ময়লা না করে থাকবো সে ব্যাপারে বেশি মনযোগ দিতাম।

এছাড়াও ছিল কমন কাপড় ধোয়ার জায়গা, যেখানে অনেকগুলো ওয়াশিং মেশিন রাখা থাকতো। কাপড় আর ডিটারজেন্ট নিয়ে এসে ধোয়া যেত কাপড় চোপড়।

প্রথমে বেশ দমে গিয়েছিলাম। জীবনে প্রথম বারের মত একা থাকার ব্যাপারটা আরো আতংকজনক হয়ে গিয়েছিল। তবে খুব শীঘ্রই নিজেকে মানিয়ে নিলাম।

দুইদিনেই এই এপার্টমেন্টটি হয়ে গেল আমার দ্বিতীয় গৃহ। অফিস থেকে বের হয়েই মনে হত কতক্ষণে পৌছুব ঘরে। হোটেল রুম এর মত বদ্ধ পরিবেশ ছিল না এখানে। রুমের সাথে একটা ছোট বারান্দা আর কিচেনেট ছিল। অর্থাৎ, প্রকৃত রান্নাঘর না থাকলেও সেখানে বেসিন, একটি ওভেন এবং ফ্রিজ ছিল। সুতরাং চাইলে আমি নিজের খাবার নিজেই তৈরি করে খেতে পারার ব্যবস্থা ছিল। তবে ঐ যে বললাম, আমার মত অকর্মার ঢেকীর জন্য সেটাও অনেক কঠিন ব্যাপার হয়ে দাড়ালো। রান্না প্রসংগে আরেকদিন লিখবো।

এপার্টমেন্টটি ছিল Dekouna এবং Saloume নামক দুই জায়গার ইন্টারসেকশানে। এপার্টমেন্ট থেকে আমাকে একটা কার্ড দেয়া হয়েছিল, যেখানে ইংরেজী, আরবী ও ফরাসী ভাষায় ঠিকানা লেখা ছিল। সেখানে পরিষ্কার ভাবে বলা ছিল "Dekouna (ডেকোয়ানে)", কিন্তু ট্যাক্সি চালকদের সেই ঠিকানা বললে তারা অন্য জায়গায় নিয়ে যেত! দুইদিন ধরা খাওয়ার পর এক ট্যাক্সি ড্রাইভার আমাকে শেখালো তুমি "saloume (সালুমে)" বলবে, তাহলে আমরা বুঝবো।



বৈরুতে শত শত ট্যাক্সি। হাজারের ঘরেও হতে পারে। জনসংখ্যা সে সময় ছিল ১৯ লাখ এর মত। এরকম অবস্থায় একই ট্যাক্সি চালকের সাথে দুইবার দেখা হবার সম্ভাবনা কতটুকু? সম্ভাব্যতা যাচাই করলে তা খুব কম পারসেন্টেজ দেখাবে, কিন্তু তারপরেও সেই উপকারী ট্যাক্সি চালকের সাথে দেখা হয়ে গেল আরেকদিন।

সেদিনও অফিসের সামনে থেকে উঠলাম ট্যাক্সি তে। সবাই তাদের নিজ নিজ গন্তব্য বলার পর আমি বললাম "ডেকোয়ানে", আর বলার সাথে সাথে সে পেছনে তাকিয়ে আমাকে দেখে এক গাল হেসে বল্ল "নো নো দোন্ত সে ডেকোয়ানে, ইউ লিভ ইন সালুমে"। আমার আসলে তার চেহারা মনে ছিল না, কিন্তু গলার আওয়াজ শুনে সব মনে পড়ে গেল।

এরপর থেকে যতবার ট্যাক্সি তে উঠেছি, সালুমে বললেই সবাই খুশি মনে জায়গা মত নিয়ে যেত।

ট্যাক্সি নিয়ে আরেকদিনের অভিজ্ঞতা বলি। সন্ধ্যার পরে রাস্তায় বেশ ভাল জ্যাম ছিল। সেদিন ছিল শুক্রবার, উইকেন্ড নাইট। আমার ইচ্ছা ছিল তাড়াতাড়ি বাসায় গিয়ে আবার বের হব। রাত ১০টার শো তে নতুন একটা মুভি দেখবো, আর ডিনার করে বাসায় ফিরবো।

তখনো আমি হোটেলে থাকি, আর সেখানে পৌছুনোর রাস্তাটি বেশ আঁকা বাঁকা; পাহাড়ী রাস্তার মত। আমি সেদিন ট্যাক্সি ড্রাইভার এর পাশের আসনে বসেছি, আর যথারীতি, আমিই ছিলাম শেষ যাত্রী। ড্রাইভারটিকে বেশ ফূর্তিবাজ মনে হল, ক্ষণে ক্ষণে শিস বাজাতে বাজাতে গাড়ী চালাচ্ছিল।

সে আমাকে প্রথমে জিজ্ঞেস করলো "where you from?". উত্তর দিলাম "বাংলাদেশ"। সাথে সাথে সে খুব খুশী হয়ে গেল। বলতে লাগলো "বাংলাদেশ পিপল ভেরি নাইস। ভেরি অনেস্ট। নেভার ডু ব্যাড থিং। পাকিস্তানি ব্যাড। দে আর থিফ এন্ড লায়ারস।"

দেশের প্রশংসা শুনে যত টা খুশী হলাম, তার চেয়ে ঢের বেশী খুশি লাগলো প্রতিবেশীদের বদনাম শুনে। আমিও বললাম "Yeah, Lebanon people also really nice". এবার উত্তর আসলো "No No, they bad. Women good, men bad. They tell lies and don't pay much".

একথা বলে সে একটা চোখ টিপি দিল। আমি বেশ মজা পেলাম। আরো অনেক গল্প হল। এক পর্যায়ে সামনের গাড়ী হঠাত স্টার্ট বন্ধ করে দিল। বহুদিনের অভ্যাস অনুযায়ী আমি অপেক্ষা করলাম কখন আমার ড্রাইভার এবং আমার পেছনের অগুনতি ড্রাইভার সমূহ কর্কশ সুরে হর্ণ বাজানো শুরু করবে।

কিন্তু ২/৩ মিনিট পরেও যখন কোন হর্ণ শুনলাম না, আমি অবাক হয়ে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, কেন সে হর্ণ বাজাচ্ছে না। সে বল্ল "কেন অযথা হর্ণ বাজাবো? নিশ্চয়ই কোন ইমার্জেন্সি হয়েছে, বা বিশেষ কোন কারণে সে গাড়ী থামিয়েছে। আমি বললাম "তোমার দেরী হয়ে যাচ্ছে না?"। সে বল্ল, হয়তো হচ্ছে, কিন্তু তারপরেও কাউকে অযথা বিরক্ত করার কোন অধিকার আমার নেই। এসব কথা বলতে বলতেই সাম্নের গাড়ী পুনরায় স্টার্ট নিল, এবং কেউ তাকে কিছু জিজ্ঞেসও করলো না, আর গালীও দিল না। ব্যস্ত সড়কে হঠাত গাড়ী থামিয়ে ২০-৩০ টা গাড়ী কে দেরী করিয়ে দেয়া যেন কোন ঘটনাই না।

বৈরুতের দুই মাসে আমি এই ব্যাপারটাই উপলব্ধি করি--জীবন মানেই নিরন্তর ছোটাছুটি নয়। সারাক্ষণ সবকিছু তে তাড়াহুড়ার ভাব দেখানো মানেই এই না যে আমি অনেক কিছু করে ফেলছি বা আমি অনেক করিতকর্মা মানুষ। কখনো কখনো ছোট ছোট ব্যাপার গুলোকে পাত্তা দিতে হয় না। কুকুর কামড় দিয়েছে, তাড়াতাড়ি ডাক্তারের কাছে যাও, জলাতংক রোগের টিকা নাও। কিন্তু মশা কামড় দিলেও যদি একই কাজ করা লাগে, তাহলে কিন্তু সমস্যা। আমাদের উচিৎ ঘটনা অনুযায়ী প্রতিক্রিয়া দেখানো, প্রতিক্রিয়া আগে ঠিক করে সেটাকে সকল ঘটনার সাথে ফিট করানোর মাঝে আসলে কোন বাহাদুরী নেই।

এপার্টমেন্ট এ থিতু হবার পর বিভিন্ন জায়গায় বেড়াতে যাওয়া শুরু করি। কলিগ দের সাথে পরামর্শ করে ঠিক করি পরবর্তী সপ্তাহে জেইতা গ্রটো তে যাব। এটি বৈরুত থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত একটি ভূগর্ভস্থ্য গুহা। চুনাপাথর ও অনান্য পাথরের সমন্বয়ে তৈরি এই গুহার দুইটি অংশ ।নিচের অংশের ভেতর দিয়ে একটি নদী প্রবাহমান, যা শহরের ১০ লক্ষ বাসিন্দার জন্য সুপেয় পানির একমাত্র উৎস।

উপরের অংশের অল্প কিছু জায়গা টুরিস্ট দের জন্য খোলা। জেইতা গ্রটো লেবানন এর শীর্ষস্থানিয় টুরিস্ট আকর্ষণ, এবং এটি "নিউ ৭ ওয়ান্ডারস" এর চূড়ান্ত তালিকায় মনোনয়ন পেয়েছিল।

এটুকু তথ্য উইকিপিডিয়া থেকেই জানতে পেরেছিলাম। বাকিটা স্বচক্ষে দেখার জন্য পরের শনিবার সকাল সকাল রউনা দিলাম। সেদিন সত্যি সত্যি ট্যাক্সি "রিজার্ভ" করেই যেতে হয়েছিল।
(চলবে)

Wednesday, May 16, 2018

Beirut Diary 6

অফিস, অফিসের পাশে বার্গার কিং, আর একটু দুরেই ছোট্ট, ছিম ছাম একটি সিনেমা হল।

হেটে চলে গেলাম একদিন সেই হলে। সেদিন ছিল মংগলবার। সপ্তাহের মাঝের একটি দিন। সোমবার সবার মন মেজাজ খারাপ থাকতো। মুখ গুঁজে কাজ করতো সবাই। মঙ্গলবারেও সে অবস্থার খুব এক্টা পরিবর্তন হত না। বৃহস্পতিবারে একটু হাসিমুখ থাকতো সবার। শুক্রবার ছিল পুরো ঈদ এর মত। বিকাল ৫টা বাজতেই সবাই উধাও হয়ে যেত অফিস থেকে। আগেও মনে হয় বলেছি এ কথা।

সে যাই হোক, হলে গিয়ে কি কি সিনেমা দেখাচ্ছে সেই তালিকায় দেখলাম তেমন পরিচিত কিংবা পছন্দনীয় কোন ছবি নেই। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে পোস্টারগুলো দেখার পর জর্জ ক্লুনির একটি সিনেমা পছন্দ হল। সে সময়ে থ্রিজির আগমণ ঘটেনি, এবং টুজি ইন্টার্নেট দিয়ে সিনেমা রিভিয় পড়ার মত সময় বা ধৈর্য কোনটাই ছিল না।

তখন বাজে সন্ধ্যা ৭ টা বেজে ৪৫ মিনিট। আর দুইটা শো বাকি সেদিনের--৮ টার আর সাড়ে ১০ টার। আমি ৮ টার শো এর টিকেট কেনার জন্য কাউন্টারের দিকে এগুলাম। আমার সামনে শুধু একটি কাপল ছিল। 

টিকেট বিক্রেতা কে খুবই উদাসিন মনে হল। যথারীতি প্রথমে আরবী তে কিছু কথা বলে ফেল্লো আমাকে ।আমি যখন ইংরেজী তে উত্তর দিলাম যে "দুঃখিত, আমি আরবী পারি না", তখন সে আরও বিরক্ত হয়ে পোস্টার গুলোর দিকে ইশারা দিল। আমিও "দ্যা আমেরিকান" লেখা পোস্টার টিতে টোকা দিলাম, এবং হাতের আংগুলের সাহায্যে বোঝালাম যে ৮ টার শো এর টিকেট চাই, এবং শুধুমাত্র একটা।

টিকেট কেনার পর নিদৃষ্ট থিয়েটারটি খুঁজে পেতে বেশ খানিকক্ষন লাগলো। ঠিক ৮টা বাজতে জায়গা খুঁজে পেলাম।

থিয়েটারের সামনে গিয়ে দেখি পুরা অন্ধকার। আমি খুব অবাক হয়ে টিকেট এর সাথে নাম মিলিয়ে দেখলাম, এবং নিশ্চিত হলাম যে আমার কোন ভুল হয় নি। হঠাত ভেতরে একটা লাইট জ্বলে উঠলো। একজন বেশ মোটাসোটা, এবং সুচালো গোফওয়ালা ব্যক্তি আমার দিকে তাকিয়ে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরেজী তে বলে উঠলো -- "You want to watch this? You sure?". মনে মনে চিন্তা করলাম, এও কি "Do you want taxi" এর মত কোন চালাকী প্রশ্ন কি না । আমি মাথা নেড়ে হ্যাঁ সূচক ইংগিত করার পর ভদ্রলোক বললেন, "Sit anywhere you want. You are the only customer"।

ভুলে যাওয়ার আগে ট্যাক্সি ফাঁদ সম্পর্কে একটু বলে নেই। আমার কলিগ জো কে বলেছিলাম অত্যধিক ট্যাক্সি ভাড়ার কথা। শুনে সে জিজ্ঞেস করলো "তুমি কি গাড়ী তে উঠে বলেছিলে যে তোমার ট্যাক্সি চাই?"। আমি বল্লাম যে, না, আমি নিজে থেকে বলি নাই। কিন্তু সবাই এই কথা কেন জিজ্ঞেস করে?

আমার এই প্রশ্ন শুনে সে হো হো করে কিছুক্ষন হাসলো। আরেক কলিগ হাস্না (হ্যাঁ, সে একজন লেবানিজ মেয়ে এবং তার নাম হাস্না!) কে ডেকে আরবীতে কি কি জানি বল্লো, এবং দু'জনে আরো কিছুক্ষন হাসলো। হাসি থামানোর পর আমাকে ওরা জানালো যে আমি বৈরুত এর ক্লাসিক ট্যাক্সি প্রতারণার শিকার হয়েছি।একটু সহজ সরল কিংবা আলাভোলা ধরণের প্যাসেঞ্জারদের কে তার প্রথমেই জিজ্ঞেস করে ট্যাক্সি চাই কি না, অর্থাৎ গাড়ী টি নিজের জন্য রিজার্ভ করতে চাই কি না!

আমরা যেটাকে "রিজাভ" বলে থাকি, ওরা সেটাকেই ট্যাক্সি বলে। ওদের সব গাড়ী গুলোই শেয়ারিং প্রক্রিয়াতে প্যাসেঞ্জার নিত। অর্থাৎ গাড়ীতে এক সাথে ৫ জন যাত্রী উঠলেও একেক জনের গন্তব্য ভিন্ন ভিন্ন, এবং ভাড়াও দুরত্ত্ব অনুযায়ী ভিন্ন। এক্ষেত্রে কেউ যদি রিজার্ভ করে নেয়, তবে তাকে সবার আগে নামানো হয়, এবং বাকিরা তারপরে নামে।

অর্থাৎ, চাইলেও কেউ সম্পূর্ণ গাড়ী রিজার্ভ করতে পারবে না। আমি যে সময়ের কথা বলছি, তখনো উবার এর জন্ম হয়নি। তারপরেও বৈরুত এর এই শেয়ারিং ভিত্তিক গাড়ী ব্যবস্থাটি আমাকে অনেক সহায়তা করেছিল পুরোটা সময়। ট্যাক্সি প্রতারণা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হবার পর আমার যাতায়াত খরচও অনেক কমে আসে।ট্যাক্সি চালকদের সাথে আমি অনেক কথা বলতাম। সে গল্প আরেকদিন বলবো। ফিরে যাই সিনেমা হলে।

সবচেয়ে সুন্দর এবং একদম মাঝখানে অবস্থিত একটি সিট দখল
করলাম। সাথে ছিল বাটারি পপ কর্ণ ও কোক। বেশ কিছু খুট খাট শব্দ শোনার পর বুঝতে পারলাম যে সিনেমা চালু হয়েছে। তখনো পুরো হল খালি।

অন্য কোন মানুষ তো দুরের কথা, একটা ছারপোকাও দেখলাম না কোথাও। খুব অল্প সময়ের মাঝেই ডুবে গেলাম সিনেমায়। জর্জ ক্লুনি একজন আততায়ী। বৃদ্ধ বয়সে তাকে তার শেষ এসাইনমেন্ট টা দেয়া হয়। এই এসাইনমেন্ট শেষ করলে সে অবসরে যেতে পারবে। তার কাজটি হচ্ছে একটি গ্রামে গিয়ে একজন কে হত্যা করা। সেখানে গিয়ে সে পড়ে গেল এক গ্রাম্য নারীর প্রেমে। বেশ জমাট গল্প। ১ ঘন্টা ৪৫ মিনিট কোন দিক দিয়ে চলে গেল, টের পেলাম না। পপ কর্ণ শেষ হলেও কোক শেষ হয়নি। কোক এর গ্লাস হাতে নিয়ে হল থেকে বের হয়ে আসলাম। আসার পথে লক্ষ্য করলাম সেই মোটাসোটা ভদ্রলোক নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। তাকে আর বিরক্ত করলাম না।

বের হয়ে এলাম ফুরফুরে মনে। সেই জীবনের প্রথম, এবং সম্ভবত শেষ বারের মত সম্পূর্ণ খালি থিয়েটারে সিনেমা দেখা। প্রথমে ভেবেছিলাম সিনেমাটি ফালতু, এজন্য দর্শক নেই। পরে বুঝলাম যে মংগলবার সন্ধ্যার প্রভাবেই হল এরকম খালি ছিল। আদতে সিনেমাটি অত খারাপ ছিল না।

ডিনার সেরে হোটেলে ফিরলাম। সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে।

(চলবে)

Thursday, May 10, 2018

Beirut Diary 5

বৈরুত এর এই স্মৃতিগুলো অনেক আগের, অনেক কিছুই আর সেভাবে মনে নেই। তবে বিশেষ কিছু দিন, কিছু ঘটনা, কিছু মানুষ আর কিছু জায়গা মনের মধ্যে দাগ কেটেছে। মূলত সে ঘটনাগুলোই বর্ণনা করার চেষ্টা করছি সেই প্রথম পর্ব থেকে।

আমার অফিসের জানালা দিয়ে দেখতে পেতাম American University of Beirut এর ক্যাম্পাস। এই অঞ্চলের অন্যতম বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সেটি, অনেক বিখ্যাত মানুষ সেখান থেকে পাশ করে বের হয়েছে। তবে বাইরে থেকে দেখে ক্যাম্পাসটি খুবই সাধারণ মনে হোত আমার কাছে।

সে যাই হোক। অফিসে প্রথম যেদিন প্রকৃতি আমাকে ডাক দিল, সেদিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে। হন্তদন্ত হয়ে এগিয়ে গেলাম টয়লেট এর দিকে। জেন্টস টয়লেট বলতে যেটাকে চিনতাম, সেখানে গিয়ে হার্ড ব্রেক কষতে হল! দেখি টি শার্ট জিন্স পরিহিতা একজন সুবেশী ললনা দরজার বাইরে অপেক্ষ্মান। "ভুল পথে এলুম নাকি" ভাবতে ভাবতেই দেখি দরজা খুলে এক ভদ্রলোক(!) বের হলেন।

এবার ক্লিয়ার হল ব্যাপারটা। ইহা একটি উভয়লিঙ্গ প্রক্ষালন কেন্দ্র! কিছুক্ষন পর সেই ভদ্রমহিলা নিষ্ক্রান্ত হবার পর আমি এগিয়ে গেলাম দরজার দিকে, এবং পূর্ব অভিজ্ঞতাবশে লাইট এর সুইচ খুজতে লাগলাম।

আবারও অবাক হওয়ার পালা। বাইরে কোন সুইচ নেই। ভাবলাম, আচ্ছা, ভেতরে নিশ্চয়ই কিছু পাওয়া যাবে। নিশ্চিন্ত মনে ঢুকলাম ভেতরে, এবং স্বয়ংক্রিয় ভাবে লাইট জ্বলে উঠলো মাথার ওপর।

সেদিন রাতে হোটেলে ফিরে বাসায় ফোন দিলাম। আমার পিতা একজন স্থপতি; নানাবিধ নতুন টেকনোলজি নিয়ে উনার অনেক উৎসাহ। 

বিপুল উতসাহের সাথে উনাকে বললামঃ

"আব্বা, তোমরা কি বাড়ী ডিজাইন করলা এতকাল। আজকে টয়লেটে ঢুকলাম আর সুইচ ছাড়াই লাইট সব জ্বলে উঠলো"
"ওহ, ওইটা মোশান সেন্সর অটো লাইট", খুব স্বাভাবিক ভাবে আব্বা উত্তর দিলেন।
"এহ! বল কি। এগুলা ঢাকায় পাওয়া যায়?"
"যাবে না কেন? নষ্ট হলে ঠিক করা ঝামেলা দেখে কেউ খুব একটা ব্যবহার করে না।"

ভেবেছিলাম বৈরুতের চমকপ্রদ গল্প বলে আব্বাকে চমকে দিব। সেই আশার বেলুনটি নিমেষে চুপসে গেল।

প্রতিদিন মোটামুটি সন্ধ্যা ৭ টা পর্যন্ত অফিস করতাম। আমার কলিগরা ৫ঃ৩০ থেকে ৬ টার মধ্যে বের হয়ে যেত। সন্ধ্যার পর আমার তেমন কিছু করার থাকতো না, তাই আমি অফিসেই বসে থাকতাম। এর মাঝে একদিন আবিষ্কার করলাম যে অফিসের কাছেই একটা সিনেমা হল আছে। 

উইকেন্ডে সিনেমা দেখা যেন যথেষ্ঠ হল না। এক মংগল বারে অফিসের পর গেলাম সেই সিনেমা হল দেখতে। সে ছিল এক অনবদ্য অনুভূতি

(চলবে)



আগের পর্বগুলিঃ
পর্ব ৪ঃ 
https://www.facebook.com/groups/ssc96hsc98/permalink/2003300166589114/
পর্ব ৩ঃ 

Wednesday, April 25, 2018

জানালার পাশে

১

রাত বাজে ৩ টা।

একটার পর একটা গাড়ী চলে যাচ্ছে ধূলোর ঝড় উড়িয়ে। গাড়ীর জোরালো শব্দ বার বার রাতের সুনশান নীরবতা কে বিঘ্নিত করছে। জানালা টা নামিয়ে দিবে ভাবছে নীল, কিন্তু আবার বাতাস টাও মন্দ লাগছে না।

(ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে গান। খুব কম ভলিউমে, কান পাতলে শোনা যায় লিরিকসঃ
The cars hiss by my window,
Like the waves down on the beach)

রাত ১ টার পর থেকে একটা অদ্ভত সময় শুরু হয়। বেশিরভাগ মানুষ ১ টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সময়টা ঘুমিয়ে উপভোগ করে। নাইট শিফট এর কর্মীদের কথা অবশ্য আলাদা।

নীল এর ৯-৫ চাকরী। সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হয়, কিন্তু তাও রাতে বেশি ঘুমায় না। বহুদিনের অভ্যাস।

(একই লাইন আবার রিপিট হচ্ছেঃ
The cars hiss by my window,
Like the waves down on the beach)

কাছেই রকি বিচ। ঢেউ এর মৃদুমন্দ ঝংকার এর সাথে প্রিয় শিল্পীর সংগীত। Blues ধাচের গান।
স্টিয়ারিং হুইল ধরে আছে মিরিন। অনেক্ষন ধরে গাড়ীর ইঞ্জিন নিস্তব্ধ। গাড়ীর সব বাতি নেভানো, শুধু স্টেরিও তে চলছে গান। নীল তাকিয়ে আছে মিরিন এর দিকে। মেয়েটা একদম হাতের নাগালের মদ্ধ্যে, কিন্ত তবু কেন জানি বহুদুরে।

(গানের পরের লাইন বাজছেঃ
I got this girl beside me
But she's out of reach )

নীল এর মনে পড়ে যায় উদ্দাম ইউনিভার্সিটি জীবনের কথা। ওর জন্ম ও বেড়ে ওঠা এ দেশেই। ছোটবেলা থেকেই গ্রেকো রোমান কুস্তিগীড় এর প্যাঁচের মত করে দৃঢ় আলিংগনে জড়িয়ে ধরেছিল সে পশ্চিমা জীবন কে। তাকে দেখলেও সহজে মানুষ বুঝতো না যে তার পূর্বপুরুষ রা এসেছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গরিব দেশটি থেকে। সে জীবনেও দেখেনি পা দিয়ে কাউকে বেশিক্ষণের জন্য ফুটবল খেলতে।

মায়ের ভাষা সে ভুলেই যেত, যদি না প্রতিদিন দেশ থেকে ফোন রিসিভ করতে হত। মা একবার কল করলে আর ছাড়তেই চেত না।

এরকমই একদিন ম্যাকডোনাল্ডস এ বসে মায়ের সাথে কথা বলছিল নীল। তাকে খাবার দিচ্ছিল একটি পূর্বদেশীয় ছিপছিপে তরুণী। ফোনে মশগুল থাকায় ভাল করে খেয়াল ও করেনি কি বলছিল তাকে মেয়েটি। সে মায়ের দীর্ঘ আলাপ থেকে মুক্তির পথ খুজছিল। মা ঘুরে ফিরে খালি একটা কথাই বলছিল।

"কোর্স শেষ করে দেশে আয়, বিয়ে কর। আমরা নাতি নাতনীর চেহারা দেখি"। কিন্ত প্রত্যুত্তরে হ্যাঁ হু ছাড়া কিছুই বলতো না নীল। আদতে তার দেশে ফেরার কোন ইচ্ছে ছিল না। অন্তত সেদিনের আগ পর্যন্ত।
হঠাত সে শুনলো একটা তরুণী তার কানের কাছে এসে বলছে "ভাইয়া, বার্গার এর সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস আর কোক নিবেন?"

থতমত খেয়ে ফোন থেকে মাথা তুল্লো নীল। প্রথম বারের মত ভাল করে খেয়াল করলো সে তার সার্ভার কে।

বেশ কিছুক্ষণ পরে সম্বিত ফিরে পেল নীল। ততক্ষনে হতোদ্যম হয়ে চলে গিয়েছে তরুণী। যে কাজ জীবনেও করে নি, সেদিন সেটাই করেছিল নীল। পকেট থেকে এক টুকরা আকাশী রঙ এর কাগজ বের করে তাতে লিখে দিয়েছিল নিজের ফোন নাম্বার। দৌড়ে গিয়ে সেই সার্ভার এর হাতে কাগজটি গুঁজে দিয়ে দেখেছিল তার লাল নীল হওয়া মুখ। কল মি মেইবি? বলে ফিরে গিয়েছিল বার্গার এর কাছে।

বর্তমানে ফিরে এল নীল।
মিরিন এর হাত স্টিয়ারিং এ, কিন্তু গাড়ী চলছে না। ঘুমাচ্ছে ও।
"ঘুমাক। বহুদিন বিশ্রাম পায়নি ও। চায়ও নি। তবে তাতে কিছু আসে যায় না"।
(ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে যাচ্ছে গিটার এর করুণ সুর)

-------------------------------------------------

২

পূর্ণিমার চাঁদের মাঝে একটি বিশেষ ধরণের মাদকতা রয়েছে। মাঝরাতে যখন গোল হয়ে চাঁদখানা মাথার উপর উঠে থাকে, তখন অন্য কোন কিছুর দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না। চাঁদের আলোর প্রতিবিম্ব সমুদ্রের পানির উপর আড়াআড়ি ভাবে পড়ে, সেটাকে দূর থেকে একটি লম্বা অট্টালিকার মত দেখা যায়। পানির কম্পনের সাথে সাথে সেই অপরুপ আলোও কাঁপতে থাকে, এবং মনে হয় যেন সরু হতে থাকা সেই প্রতিবিম্ব ধরে সাঁতরে চলে যাওয়া যাবে চাঁদে।

পূর্ণিমা মানেই মিরিন থাকবে চন্দ্রাহত। পাশে বসে থাকবে ঘন্টার পর ঘন্টা, কিন্তু চোখ থাকবে আকাশের দিকে। নীল প্রথম প্রথম অবাক হত, কিন্তু পরে ব্যাপারটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।

থেমে থাকা গাড়ী তে বসে মিরিন এর দিকে অপলক দৃষ্টিতে আরো কিছুক্ষন চেয়ে থাকলো নীল। আবার ফিরে গেল সে অতীতে।

ম্যাক এ লাঞ্চ করার পর বেশ কিছুদিন চলে গিয়েছে। সেদিনের পাগলামি আচরণ এর কথা মনে পড়লে নীল এর ফর্সা মুখে লাল বেগুনী রঙ ফুটে উঠে। সেদিন ভার্সিটি ডর্মে আড্ডা মারতে মারতে হঠাত আনমনা হয়ে সেদিনের কথা ভাবছিল নীল। স্প্যানিশ বান্ধবী মারিয়া ওর মুখের সামনে জোরে তুড়ি বাজানোর পর তার সম্বিত ফিরলো। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে, কি হচ্ছে বোঝার আগেই মারিয়া উধাও, দূর থেকে ক্যাটওয়াক দেখা আর "idiota!" ডাক শোনা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না তার।

আবার ডুবে গেল সে দিবাস্বপ্নে। নিরীহ মেয়েটি অনেক লজ্জা পেয়েছিল সেদিন! ওর হাতে মোটামুটি জোর করেই তার নাম্বার টা ধরিয়ে দিয়েছিল নীল, কিন্ত মেয়েটি মাথা তার দিকে একবারো তাকায়নি।

কাগজ টা নিয়েছিল সে। ছিঁড়ে ফেলে দেয়নি, মুঠোবন্ধ করে রেখেছে।তার নামটিও জানা হয় নি সেদিন । নীল যখন গট গট করে বেরিয়ে যাচ্ছিল রেস্তোরা থেকে, সে একবারো ফিরে তাকায়নি। তাকালে দেখতে পেত তার পিঠের ওপর স্থির হয়ে আছে এক জোড়া মায়াবী, প্রায় আদ্র চোখ।

ডর্ম থেকে বেরিয়ে ক্লাশে গেল নীল। ক্লাশেও খুব একটা মনোযোগ দিতে পারলো না সেদিন। ক্লাশ শেষে খেয়াল করলো দূর থেকে মারিয়া ওকে দেখছে। হয়তো ভাবছে সে এগিয়ে গিয়ে সরি বলবে। তবে নীল এর মন সেদিন অন্যদিকে ছিল। বিস্মিত হয়ে ক্লাস এর সেরা সুন্দরী খেয়াল করলো তাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে গটগট করে বেরিয়ে গেল পূর্বদেশীয় হ্যান্ডসাম ছেলেটি। অস্ফুটে আবার বলে উঠলো সে "ইডিওটা!"।

ভার্সিটি সংলগ্ন পার্কে চলে গেল নীল। ও নিজেও জানে না কিভাবে কিভাবে সে পাথরের তৈরি বেঞ্চ এর সামনে চলে এল। ক্লাশ রুম থেকে এখানে আসা পর্যন্ত পথটির কোন স্মৃতি তার নেই। খালি মনে পড়ছে মেয়েটির লাল হলুদ ইউনিফর্মের সাথে সম্পূর্ণ বেমানান নীল রঙ এর কানের দুল এর কথা।

পার্কের নিস্তব্ধতা কে ভেঙ্গে দিয়ে একটি অচেনা নাম্বার থেকে কল এল, বেজে উঠলো লাস্ট রিসোর্ট গানের প্রথম পংক্তি দ্বয়ঃ
"Cut my life into pieces
This is my last resort"

অচেনা কন্ঠ, কিন্তু শুনেই নীল বুঝলো সেই রেস্টুরেন্ট ললনা ফোন করেছে। ১০ মিনিট এর সংক্ষিপ্ত আলাপ। সেখান থেকে কফি শপে দেখা। প্রতি সপ্তাহের রুটিন প্রতিদিনের রুটিনে যেতে বেশিদিন লাগেনি। একই শহরে থাকতো দু'জনে, তবে বিপরীত প্রান্তে।

দুইজনের মধ্যে তেমন কোন মিল ছিল না। নীল ছিল অনেক সরব, মিরিন ছিল লাজুক। নীল থাকতো আসরের মধ্যমণি হয়ে, আর মিরিন এর একমাত্র সঙ্গী ছিল তার পোষা জ্যাক রাসেল টেরিয়ার কুকুরটি। আদর করে তাকে সে ডাকতো "বু" বলে।নীল ছিল অবস্থাপন্ন পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান, আর মিরিন ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের আশা ভরসার প্রতীক।

মিরিন বেশি কিছু বলতো না, মুখ টিপে হাসতো খালি, আর শুনতো নীল এর শিশুদের মত হাত নেড়ে নেড়ে বলা মিষ্টী কথা গুলি। নীল প্রায়ই অভিযোগ করতো "তুমি এত কম কথা বল কেন?"। মিরিন বলেছিল "আমি লিখতে পারি, বলতে পারি না"।

দেখা হওয়ার ঠিক এক মাসের মাথায় দেশ থেকে এল জরুরী তলব, সাত দিনের নোটিশে নীল ফিরে গেলে দেশে--অসুস্থ্য মা কে দেখতে। পৌছে গিয়ে পেল বড় বড় কিছু সারপ্রাইজ। দ্বিতয় দিনে নীল এর মেইল বক্সে এল হাতে লিখা নীল খামের চিঠি। কাগজ টি সাদা, হাল্কা ল্য্যাভেন্ডার পারফিউম এর সুগন্ধ মাখা। সেখানে গোটা গোটা হাতে নীল কালিতে লিখা একটি কবিতা, যা নীল এর জীবন কে ওলট পালট করে দেয় নিমিষে।

"উষার আকাশের নব উদিত তারার আভাসে আঁঁচও করিনি,
একদিন.....
হৃদয়মম উচ্ছলিয়া প্রনয় গাঁথা রচিব।
এমন প্রেমোন্মত্তে সিক্ত হবো।
সদাই বিমোহিত হয় অবারিত মন....
আমার ছায়াপথ কেনো
পুরোটাই তোমায় আচ্ছন্ন!
আমার আকাশপটে কেনো
কেবলি তুমিই!
পূর্ণিমাতিথিতে সাগরের জলরাশির উন্মাদনার মতো,
একদিন......
পুরোটাই আমি কেনো তোমায় সঁপে দেবো!
তবে.....
সব প্রাপ্তিযোগে পূর্ণতা আসে না !
শুধু হয় মুগ্ধতার সলিলসমাধি।
তাই......
পূর্ণতা নয়!
মুগ্ধতার রঙধনুতে প্রোজ্জ্বল হোক
আমার সরোবর।
ঠিক তেমনি করে,
একদিন.....
এক আকাশ মুগ্ধতা নিয়ে
মিলিয়ে যাবো অমানিশার কালান্তরে।"

এক নিমিষে পড়ে ফেল্লো নীল। তারপর আবার। কমপক্ষে ২০-৩০ বার পড়লো চিঠিখানা। কিন্তু আবেগ কে নিয়ন্ত্রণ করে রাখলো সে, ভাবলো চিঠির উত্তরে চিঠিই দিতে হবে। হাতে তুলে নিল কাগজ কলম, কিন্তু দুই লাইন এর বেশি আগালো না। তখনো সে বোঝেনি যে মিরিন এর চিঠির চেয়েও বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিল ওর জন্য।

অসুস্থ্য মা পরের দিন তার হাত ধরে একটি অনুরোধ করলেন।
----------------------------------
৩

মিরিন এর মনের মাঝে চলছে ঝড় ঝঞ্ঝা। উত্তাল সাগরের ঢেউ এর মত একেক পর এক চিন্তা আছড়ে পড়ছে মনের মাঝে।বু কে সিরিয়াস বকা দিয়েছে ও। প্রতিদিনের মত কাজ থেকে ফিরে ঘরে ঢোকার সাথে সাথে ওর কোলে ঝাপিয়ে পড়েছিল আদুরে ডাক দিতে দিতে, কিন্তু জীবনেও যা করিনে মিরিন আজ তা করে ফেলেছে নির্দ্বিধায়--ঝটকা দিয়ে বু কে ফেলে দিয়েছে কোল থেকে। আহত ও ব্যাথিত মানব সন্তানের মত মায়াকাড়া দৃষ্টিতে বু তাকিয়ে ছিল মিরিন এর দিকে। দুঃখ ও অভিমানের মিশ্রণে বোবা কান্না কেঁদেছিল বেশ কিছুক্ষণ।

(ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে মৃদু সুরে কান্ট্রি সং)
("Me and you and a dog named boo
Travellin' and livin' off the land")

প্রবাস জীবনের প্রায় শুরু থেকেই বু তার বেস্ট ফ্রেন্ড। ক্লাশ শেষে একদিন হেটে বাসায় ফেরার সময় একটা পেট শপ এর সামনে থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল মিরিন। অতিকায় কৃশকায় ছেলেটাকে সে শুধুই মনে রেখেছে "পেট শপ বয়" হিসেবে। এর আগে কখনোই সে দেখেনি এত লম্বা কোন মানুষ। বেহায়ার মত চেয়ে ছিল ছেলেটির দিকে, কোন রকম ভালবাসা কিংবা ভাল লাগার অনুভব নিয়ে নয়, বড়ং বোবা কৌতুহল থেকে।

"Yo girl, whassup? What'cha lookin at?" শুনে সম্বিত ফিরেছিল ওর।
ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে পেট শপ বয়েজ এর গান
(Every time I see you something happens to me
Like a chain reaction between you and me
My heart starts missing a beat
My heart starts missing a beat
Every time
Oh oh oh, every time)

মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গিয়েছিল সেই পোষা প্রাণীর দোকানে, আর প্রায় এক ঘন্টা লাগিয়ে কিনেছিল জ্যাক টেরিয়ার রাসেল কুকুরটি। জারমেইন ওকে জানিয়েছিল যে এই কুকুরটি আগে আরেক বাসায় ছিল, ওরা ওকে "বু" ডাকতো। ও আর নাম টা বদলায়নি। জারমেইন এর সাথেও আর কখনো দেখা হয় নি ওর।কিভাবে বু আরেক বাসা থেকে ওর দোকানে এল, সেটাও আর জানতে চায়নি মিরিন।

এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে হাত থেকে ছুড়ে মারলো সে ব্রাউন খামটি। ভেতরে ভারী কিছু না থাকায় ঘুরতে ঘুরেতে বুমেরাং এর মত সেটি গিয়ে গোত্তা খেল বই এর আলমারীর কাঁচের সাথে। খামের একটি কোনা আটকে গেল কাঠের ফ্রেম এর সাথে। এয়ার কুলার এর বাতাসের ধাক্কায় চিঠিটা কাঁপতে থাকলো ক্রমাগত।

মনের বিষন্নতা কে দূর করার জন্য টিভি ছাড়লো ও। তখনো শোনা যাচ্ছে অবোধ প্রাণীটির ক্ষীন আওয়াজ। টিভি ছাড়ার সাথে সাথেই শুরু হল আবহাওয়ার বার্তা।

"Welcome to tomorrow's weather forecast. Tomorrow will be a sunny day and the sky will be in its bluest form. It will be a perfect day to visit the blue sea and to gaze at the blue sky all day long".
"ধেত্তেরি, সব খানে খালি নীল আর নীল!" বলে টিভি বন্ধ করে রিমোট টা মোটামুটি ছুড়েই ফেল্ল মিরিন।

মিরিন এর প্রায় সব ক্লাশমেট ডর্মে কিংবা রুমমেট নিয়ে থাকে। ছোটবেলা থেকেই ও এক্টূ ইন্ট্রোভার্ট টাইপ; ডর্মে থাকার কথা ও কল্পনাও করতে পারে না! বিশেষ করে এক সিনেমায় ডর্ম এর শেয়ার্ড ওয়াশরুমের ভয়াবহ নমুনা দেখার পর থেকে ওর ডর্ম ভীতি অন্য লেভেলে চলে গিয়েছে।

রুমমেট এর ব্যাপারে ও অনেক ভেবেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও দ্বিধা, দ্বন্দ্ব ও ভয় ওকে বাধা দিয়েছে এতকাল । হঠাত ওর গালে লাল আভা ফুটে উঠলো। ভেবেছিল এবার ফিরলে নীল কে বলবে ওর রুম মেট হতে। ওর ব্যাপারে বিন্ধুমাত্র দ্বিধাও ছিল না ওর মনে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার চোখ টা গেল আধ-ঝুলন্ত খামটির দিকে। খামটির মতই ওর আর নীল এর সম্পর্ক এখন দূর্বল ভিত্তির উপর।

আজকাল আর কেউ পেপারওয়েট ব্যাবহার করে না, কিন্তু তারপরেও কেন জানি একটা ছিল মিরিন এর বাসায়। প্রবল ক্রোধের সাথে হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল সে পেপার ওয়েট টি। ফুঁসতে লাগলো রাগে...
--------------------------------------------------------------------
৪

অনেকক্ষণ ধরে গাড়ীর স্টার্ট বন্ধ। ফুয়েল ট্যাংক প্রায় খালি। এখন গাড়ী চালালেও খুব বেশী দূর যেতে পারবে না নীল। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ড্রাইভিং সিট দখল করে আছে মিরিন।

রকি বিচের ঢেউ গুলোর কোন বিকার নেই। বিরতিহীন ভাবে আছড়ে পড়ছে পাড়ে। শব্দটা যেন বহুদুর থেকে আসছে। কানে ঢুকছে, আবার ঢুকছে না। আলাদা করে খেয়াল করার মত না, আবার অবজ্ঞা করার মতও না। একেক টা ঢেউ যেন নাড়া দিয়ে যাচ্ছে মষ্টিষ্কের কোন এক বিশেষ জায়গায়, মনে পড়ে যাচ্ছে টুকরো টুকরো স্মৃতি।

প্রায় দুই ঘন্টা ধরে একই জায়গায়, একই ভাবে বসে আছে ও। চারপাশের পটভূমিকায় তেমন কোন পরিবর্তন নেই। মনে হচ্ছে যোহান স্ট্রাউস একটানা বাজিয়ে যাচ্ছে তার নীল দানিউব অর্কেস্ট্রা। কখন জানি গাড়ীর স্টেরিও বন্ধ হয়ে কল্পনার সংগীত বাজা শুরু হয়েছে। এই সুর তার চির চেনা, জীবনে অসংখ্য বার শুনেছে ও। এত বেশি যে চোখ বন্ধ কর হাত দু'টো মাথার পেছনে নিয়ে হেলান দিলেয় বাজা শুরু হয়। আজকে বোনাস হিসেবে সাথে আছে ঢেউ এর বাজনা।।

১ টা ১১ মিনিটে একটি পুলিশ প্যাট্রল কার দেখতে পেল নীল। ডজ চার্জার গাড়ীটির ক্রম অগ্রসরমান অবয়ব দেখে আশাবাদী হয়ে গেল ও। সম্ভবত অফিসারটি তার শিফট শেষ করে বাড়ীর পথে যাচ্ছিল। বিচের ধারে থেমে থাকা ধূসর ফোর্ড মাস্ট্যাং গাড়ীটিকে দেখেও দেখলো না কেন জানি। এমন কি, গতিও কমালো না একটু। কিছুটা মন খারাপ, আর কিছুটা আশ্বস্ত হওয়ার মিশ্র অনুভূতি হল নীল এর। হয়তো বা সেই অজানা পুলিশ অফিসারটা বেচে গেল শেষ রাতের উদ্ধার কর্ম থেকে।

আসলেই কি একজন পুলিশ অফিসার পারবে নীল ও মিরিন কে উদ্ধার করতে? ভাবতে ভাবতে হেসে উঠলো নীল। হাত বাড়ালো গ্লোভ কম্পার্ট্মেন্ট এ। ওখানেই লাইটার আর রথম্যানস এর কিং সাইজ প্যাকেট। খুলেই মনে পড়লো, গত সপ্তাহেই রাগ করে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে মিরিন ওর সাধের সিগারেট আর লাইটার।

এ তো এক ধরনের ভালবাসাই, নাকি? ডাক্তার তো মানাই করেছে ধুম্রশলাকা টানতে। কিন্তু, কিন্তু, এ তো এক ধরনের অত্যাচারও, নাকি? আর ভাবতে পারে না নীল। চিৎকার গুলো কানে বাজতে থাকে। চিল কন্ঠি মিরিন...

সময় থেমে আছে বীচের ধারের এক টুকরো কাজ চালিয়ে নেয়ার পার্কিং স্পেস এ। হাত ঘড়িটির দম ফুরিয়ে গেছে, ১ঃ১১ তেই থেমে আছে কাটা। অন্য যেকোন দিন হলে নীল প্যানিক এটাক এর শিকার হত। ঘড়ির কাটার সাথে মিলিয়ে তার এক্সিকিউটিভ জীবন। হয় ঘড়ি নাহলে মোবাইল, যেকোন এক মাধ্যমে সময় জানা লাগবেই। মোবাইলের চার্জ অনেক আগেই শেষ।

আজকের ঘটনা ভিন্ন। আজকে নীল এর হাতে অফুরন্ত সময় এবং তার একটুও টেনশান হচ্ছে না। অনেকক্ষন আটকে রাখা দীর্ঘঃস্বাস ছেড়ে দিলে যেরকম আনন্দ হয়, সেরকম আনন্দ হচ্ছে নীল এর।

হাইওয়ে ৮৯ দিয়ে ফিরছিল ওরা। প্রতিদিনের মত আজকেও নীল এর কফি বানানো ও মিরিন এর ড্রাইভ করার পালা। বহুকাল আগে কবে জানি এই দৈনন্দিন দায়িত্ব ওরা ভাগ করে নিয়েছিল। দুইজনেই দেরি করে ফিরে কাজ থেকে। মিরিন এর কাজ শেষ হয় আগে, ও অফিসে ওভারটাইম করে নীল কে তার অফিস থেকে পিক করে নিয়ে বাসায় ফিরতো। অন্তত নীল তাই জানতো, অল্প কিছুদিন আগ পর্যন্ত।

কোন কোন দিন রকি বিচের ধারে গাড়ী পার্ক করে কিছুক্ষণ বিরতী নিত ওরা। ওদের দুইজনের একটি সিক্রেট হাইড আউট আছে যেখানে গাড়ী পার্ক করলে হাইওয়ে থেকে কিছু দেখা যায় না। আজকেও সেই বিশেষ জায়গায় গাড়ী টি পার্ক করা। মূলত এ কারণেই প্যাট্রল কার ওদেরকে দেখতে পায়নি।

ড্রাইভ ইন মুভির মত ঘন্টার পর ঘন্টা গাড়ীতে বসে আড্ডা দিয়েছে ওরা অনেকবার। সমুদ্রতট এর চেয়ে চিত্তাকর্ষক সিনেমা আর কি হতে পারে? শুক্রবার রাতে সবাই যখন বিভিন্ন ক্লাবে কিংবা আনন্দ ফূর্তির জায়গায় সময় কাটাচ্ছে, ওরা দুইজন তখন তাদের এই লুকানো জায়গায় মেতে উঠতো আদিম ভালবাসায়। কোন এক রাতে বাজি তে হেরে দু'জন দু'জন কে তাড়া করেছিল বীচের এক মাথা থেকে আরেক মাথায়। গাড়ী তে ফিরে, ছেড়ে যাওয়া কাপড় পড়ে, থার্মোস থেকে দুই কাপ কফি খাওয়ার পরেও অনেকক্ষন কমেনি মিরিন এর ঠকঠকানি।

আজকেও থার্মোস এ কফি ছিল, কিন্তু নিজে খায় নি ও। মিরিন কে খেতে দিয়েছে। নীল জানে আজকে ও ওর জীবনের সেরা কফিটি বানাতে পেরেছে।
---------------------------------------------------------------------------------------------------

৫

"It is Done"
এক নিঃশ্বাসে লিখলো মিরিন। পাঠিয়ে দিল নীল কে।

তখন নীল ব্যস্ত ছিল। সারা গা থেকে ঘাম ঝড়ে পড়ছে, পরিশ্রান্ত দেহ থেকে টপ টপ করে পড়ছে ঘাম গুলো অশ্রু ফোটার মত ধীর লয়ে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে থেকেও জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিচ্ছিল ও। হঠাত আইফোনের চিরাচরিত মেসেজ ডেলিভারীর শব্দ টা পেয়ে বিরক্তির সাথে উঠে দাড়ালো সে। পাশে সরিয়ে দিল এতক্ষন বাহুডোরে আকড়ে ধরে রাখা ডাম্ববেল দু'টি।

মেসেজ স্ক্রীন এর দিকে দুই তিন মূহুর্ত তাকিয়ে রইলো নীল। মনেই করতে পারছিল না কোন কাজটি সম্পন্ন হয়েছে। পরে মনে পড়লো, উত্তর না পেলেও মিরিন এর ছেলেমানুষি একমুখী মেসেজ চালাচালির অভ্যেসটা এখনো যায়নি। আগেও এরকম করতো। নিজেই প্রশ্ন করে নিজেই আবার উত্তর দিয়ে দিত।

"আচ্ছা, আজকে টমেটো সুপ বানাবো না ক্যাবেজ সুপ?
ওহ, ক্যাবেজ তো নাই বাসায়, টমেটোই সই।
আচ্ছা, টমেটো বেশী শক্ত শক্ত ছিল, সুপ না বানিয়ে সালাদ বানিয়েছি।
কখন আসবে?
না আসলেও সমস্যা নাই, আমি খাব না।
অনেক খিদা, এখনো আস না কেন?
খেয়ে ফেললাম কিন্তু
It is done"

"তার মানে হচ্ছে, উনি খেয়ে ফেলেছেন। আর আমি ভেবেছি না জানি কি!" - গজ গজ করতে করতে সে ফিরে গেল তার ডাম্বেল আর ওয়ার্ক আউট পার্টনার এর কাছে।

"What happened Neal?"
"Nothing serious, babe.
Then why do you look so pissed off?
Never mind, let's get back to work"

অল্প সময়ের মধ্যে তারা ফিরে গেল ওয়ার্ক আউট এ। দু'জনের মনে একই চিন্তা, কঠিন পরিশ্রমের পরেই আসে ভাল সময়। জিমের পাশেই সেই স্বর্ণকেশী বিদেশীনির ফ্ল্যাট।

ভাবতে ভাবতে বর্তমানে ফিরে আসে নীল। মিরিন এর পুরনো মেসেজ ঘেটে সেদিনের কথোপকথন টি খুজে বের করার অদম্য ইচ্ছা জাগে তার মনে। কিন্তু তা না করে সে নিউ মেসেজ অপশানে গেল। লিখা শুরু করলোঃ

It is done
But it doesn't feel right
We have been wallowed in the mire
As if our love became a funeral pyre
But I also made it right.

মেসেজ টা আর পাঠানো হল না। মনে পড়ে গেল নীল এর, ওদের সিক্রেট হাইড আউটে আছে ওরা। এখানে নেটওয়ার্ক নেই। মেসেজ ডেলিভারী ফেইল হয়ে লেখাগুলো ড্রাফট এ চলে গেল।

আবার জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে থাকা। বৃষ্টি টা জোরালো হয়েছে। মনে হচ্ছে প্রতিটি বৃষ্টির ফোটা ঘুচিয়ে দিচ্ছে গ্লানি, আর পবিত্র করে দিচ্ছে অন্তর। হঠাত পাশের সিটে চোখ গেল নীল এর।

সেই চির পরিচিত, নিষ্পাপ চেহারা। স্টিয়ারিং এ মাথা রেখে ঘুমাচ্ছে যেন। সেই লাজুক হাসি মাখা ওয়েট্রেসটি। বক বক করে মাথা ধরিয়ে দিত, কিন্তু যেকোন সিদ্ধান্ত নিত ঠান্ডা মাথায়। শুধু নীল এর উপর ভরসা করার ক্ষেত্রে কোন চিন্তা করতো না। আজও কিছু না ভেবেই খেয়ে নিল কফি।

দুই কাপ কফি খেয়ে কেউ এভাবে ঘুমায়?

হঠাত চারদিক অন্ধকার হয়ে এল নীল এর। এতক্ষন যেন একটা ঘোর এর মধ্যে ছিল ও। মনে পড়ে গেল বিষ সংগ্রহের কষ্টকর প্রয়াসের কথা। অনেক খুজে বের করেছিল সেই বিষ, যা সহজেই কোন পানীয়র সাথে মিশিয়ে দেয়া যায়।

চাঁদ ডুবে গিয়েছে কখন জানি। জিম মরিসন তখনো করুন সুরে গেয়ে যাচ্ছে জানালার পাশ দিয়ে গাড়ী ছুটে চলার সংগীত। কখন জানি সিডি টা আবার চলতে শুরু করেছে।

গাড়ী থেকে বের হয়ে হেটে হেটে সুমুদ্রের পাড়ে চলে এল নীল। শুনতে পেল মেসেজ ডেলিভার হবার পরিচিত সুর। পকেট থেকে ফোন বের করে ৯১১ এ কল দিল।
"Hello, there has been a murder. Yes, I am the killer".

ফোন টা ছুড়ে মারলো নীল। এটার আর দরকার হবে না। ফিরে এল আবার গাড়ীর কাছে।

পকেট থেকে বের করে বাকি বিষটুকু ঢেলে নিল থার্মোস এ। ঢক ঢক করে গিলে নিলে বাকি থাকা কফিটুকু। ঠান্ডা কফি, খেতে গিয়ে মুখ টা বিকৃত করে ফেল্ল নীল।
কে যে এইসব ছাইপাশ বানায়?

দূর থেকে একটা বাচ্চা কুকুরের চিৎকার ভেসে আসছে যেন। সত্য না কল্পনা, ঠিক বুঝতে পারলো না নীল। বু এর কথা মনে পড়লো। আহারে! বেচারা দ্বিতীয় বারের মত এতিম হল।

মিরিন এর মাথার পাশে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লো নীল। পুলিশের গাড়ীর জোরালো শব্দ কাছে চলে আস্তে লাগলো।

আর কোন শব্দ নেই চার পাশে।
(শেষ)