Monday, November 04, 2019

ইরিকারাহা

"ইরিকারাহা"



"রিকি! রিকি! শুনতে পাচ্ছো?"

ডাকটা যেন অনেক দূর থেকে আসছে। কান খাড়া করে শুনেও রিকি বুঝতে পারলো না বার্তাটি কোন ফ্রিকোয়েন্সী তে আসছে। সে তার কপোট্রন থেকে রেডিও সিগ্নালিং ডিভাইসটিতে নির্দেশ পাঠালো সিগনালটিকে আরো ভালো ভাবে টিউন করার জন্য। কিছুক্ষণের মধ্যে সিগনালটি পরিষ্কার হল। সে বুঝতে পারলো, ভূমধ্যসাগরের ওপার থেকে তার বন্ধু এরেবাস তাকে খুজছে।

রিখি একজন "গোর্মে ২৯" সিরিজের রাঁধুনি রোবট। প্রথম রাঁধুনি রোবটটির নাম ছিল রামসি। রামসি স্টেক ভালো রান্না করতে পারলেও ভারতীয় কোন ডিশ রান্না করতে গেলেই ভজভট পাকিয়ে ফেলতো।ফলশ্রুতিতে ক্ষুদ্ধ ভোক্তাদের মুহুর্মুহু অভিযোগে সিরিজটি বাতিল করতে বাধ্য হয় এপ্সিলন কর্প।

পরবর্তী কালে একে একে রামসি ২,৩,৪ করে করে ২৫ নম্বর পর্যন্ত রোবট বানিয়েও এপসিলন কর্পোরেশন তাদের মনের মত রাঁধুনি রোবটটি খুজে পেল না। তারপর রিকির বর্তমান বস প্রফেসর শ্যাঙ্কেন আর তার স্ত্রী মায়রেন শেলীন এ প্রজেক্টে যোগ দিয়ে একটি স্বয়ংসম্পুর্ণ মডেল তৈরি করতে সমর্থ হন।

তাদের কাজে খুশী হয়ে এপসিলনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যাঙ্কেন কে বলেন সিরিজটির একটি নতুন নাম দিতে। তার দৃষ্টিতে রামসি নামটা কুফা ব্যাতিত কিছুই না!

অল্প সময়ের মধ্যে গোর্মে ২৬ এর জন্ম হল।গোর্মে ২৯ রিলিজ হবার পর সমগ্র মানব জাতির রান্না করার প্রয়োজনীয়তা উবে গেলো। একটি গোর্মে রোবট রন্ধন কাজে এতই পারদর্শী যে সে একাই হাজার দশেক লোকের দৈনিক খাবারের ব্যবস্থা করে ফেলতে পারতো।

এপসিলন কর্প এর জন্য সেদিনটি ছিল বিশেষ সম্মানের। এপ্সিলন এর ব্র্যান্ড এর রঙ অনুযায়ী সেদিনটি আজো পালন করা হয় লাল রঙ এর সাজসজ্জার মাধ্যমে। দিবসটি "ইরিকারাহা দিবস" নামে পরিচিত। রোবটদের প্রোগ্রামিং ভাষা চিকিভ এ ইরিকারাহা শব্দটির মানে রক্তিম শুভেচ্ছা।

১৬ সেপ্টেম্বর, ৩০৪২ সাল। জনাকীর্ণ এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধাণ নির্বাহী বার্জিলিয়াস ঘোষণা দিলেনঃ

"আমরা পেরেছি!
আমরা পেরেছি মানুষ কে সকল কাজ থেকে অব্যাহতি দিতে।
আমাদের রোবটেরা এখন সুদূর প্লুটোর রেসিপি থেকে শুরু করে প্রাচীন মিসরীয় ও মেসোপটেমিয় রেসেপিতেও খাদ্য প্রস্তুত করতে পারে।
আপ্নারা নিশ্চয়ই অবগত আছেন যে আমাদের অন্যান্য সিরিজের রোবটগণ গল্প ও কবিতা লেখা, আগুন নেভানো, গ্রহাণুপুঞ্জ ধবংস করা, ট্রেনের টিকেট চেকিং, ব্যাংকের ক্যাশিয়ার এর কাজ সহ যেকোন কাযে আরো আগে থেকেই পারদর্শী। আপনাদের উদ্দেশ্যে আমার চ্যালেঞ্জ, সারাদিন চিন্তা করে একটি কাজ খুজে বের করেন, যা আমাদের রোবট করতে পারবে না।"

এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলেন, "আপনাদের রোবট কি ক্যান্ডি ক্রাশ খেলতে পারে?"

প্রশ্ন শুনে হেসে ফেললেন বার্জিলিয়াস। উত্তরে বললেন "আপনি চাইলে সে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি তৈরি করে নিজে গেমের ভেতরে ঢুকে গিয়ে খেলে দেখাবে"।

"আমি নিজে ঢুকতে পারবো, ক্যান্ডি ক্রাশের ভেতরে?"
"ইয়ে মানে, আপনার নিজের ঢোকার কি দরকার? সেই প্রযুক্তি তো কবেই পুরনো হয়ে গিয়েছে। প্রোগেমার ৬৬ রোবট আপনার হয়ে এই কাজটি করে দিবে"

তরুণ সেই সাংবাদিকটি খুব একটা সন্তুষ্ট হতে পারলো না। আস্তে আস্তে বল্লো "নিজে করতে না পারলে মজা কোথায়?"।

বার্জিলিয়াস সেটি খেয়াল করলেন না। চলে গেলেন পরের প্রশ্নে।

রিকি বার্জিলিয়াস এর সেই সংবাদ সম্মেলনের ভিডিও ক্লিপটি অনেকবার দেখেছে। রোবটদের ইতিহাস তার প্রিয় বিষয়। যখন রান্না করা লাগে না, তখন অবসর সময়ে বসে বসে সে ইতিহাস চর্চা করে। এই সময়টা সে তার কপোট্রন কে কর্ভাসের সাথে সংযুক্ত করে নেয়। কর্ভাস হচ্ছে কেন্দ্রীয় তথ্যসম্ভার। যেকোন প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলে সব রোবট কর্ভাস এর খোজ করে।

মাঝে মাঝে রিকি শাফল মোডে পুরনো ভিডিও দেখতে থাকে।

আজ হঠাত তার প্রিয় একটি ভিডিও চলে আসে। এক সাথে দু'টি রুমের দৃশ্য। এক রুমে বেশ মোটা মোটা অনেকগুলো লোক। সবার পরনে জল্পাই সবুজ রঙ এর আর্মি পোষাক। অর্ধেক মানুষ ঘুমে, বাকিরাও চরম বিরক্ত। তাদের মধ্যে নেতাগোছের একজন হঠাত বলে উঠলেন

"আবাল গুলার আবলামি শেষ হইসে?"
২/৩ মিনিট পর একজন জানালো "না স্যার, মাত্র শুরু হইলো"।
"যত্তসব বালছাল", বলে নেতা স্ক্রিণের দিকে নজর দিলেম।

স্ক্রিণে আরেকটি রুমের দৃশ্য। ওখানে হলুদ পোষাকের বিপ্লবী দল। শুশ্রুমন্ডিত একজন সৌম্যদর্শন বৃদ্ধ এই দলটির নেতা। তিনিও ঝিমাচ্ছেন আর একটি বড় স্ক্রিণের দিকে তাকিয়ে আছেন। তার ঠোটে একটি বেঢপ আকৃতির হাভানা চুরুট এবং মাথায় একটি টুপি। সেই ব্যক্তিটি কি বলছেন তার কিছুই শোনা যাচ্ছে না, শুধু সেন্সর হুওয়ার টুট টুট শব্দ পাওয়া যাচ্ছে।

হঠাত এই দুই রুম সরে গিয়ে সেই বড় স্ক্রিণটি ফুটে উঠলো। দেখা গেলো ২টি রোবট দাঁড়িয়ে একজন আরেকজন কে আঘাত করছে। যুদ্ধের দুই পক্ষের প্রতীক হিসেবে একটি রোবটের রঙ জল্পাই সবুজ, আর আরেকটির রঙ হলুদ। ওয়ার সিমুলেটর ৫.১১ এর নিয়ম অনুসারে শুধুমাত্র শলার ঝাড়ু কে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা যাবে।

দু'টি রোবট একজন আরেকজন কে ঝাড়ু দিয়ে পিটিয়ে আঘাত করছে। স্ক্রিণে লেখা উঠছে

"ডিফেন্ডার রোবট ড্যামেজ লেভেল ১১২%

রেবেল রোবট ড্যামেজ লেভেল ১১১.৯%"

কিছুক্ষণ পর ভিডিওটি শেষ হল একটি বার্তার মাধ্যমে।

"৩১৫২ সালে ষষ্ঠ বিশ্বযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল। এই যুদ্ধে কেউ জয়ী হয়নি। ১০ বছর অপেক্ষা করার পরেও ফল না আসায় ক্লান্ত ও বিষন্ন হয়ে পারষ্পরিক সমঝোতার ভিত্তিতে দুই পক্ষই চলে গিয়েছিল ইরিকারাহা দিবস পালন করতে।

হঠাত রিকির সংবিত ফিরে এল। প্রফেসর এবং তার মিসেস এর লাঞ্চ সার্ভ করার সময় হয়ে গিয়েছে। এরেবাস কে একটি সংক্ষিপ্ত বার্তা পাঠিয়ে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে এগুলো রিকি। রান্নাঘরে ওভেন, ফ্রিজ, চুলা সহ সকল আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি সুন্দর করে সাজানো রয়েছে। কিন্তু রিকি গত এক শতাব্দীর মধ্যে এগুলো ব্যবহার করেনি। রোবটদের রান্নার জন্য এগুলো কিছুই লাগে না। সে এবার মেনু সাজানো শুরু করেঃ

এসপারাগাস সুপ

রাশিয়ান সালাদ

হায়দ্রাবাদী দম বিরিয়ানী

বন মোরগের রোস্ট

তিতির পাখির ডিম ভুনা

কচি ভেড়ার স্টেক আর ম্যাশড পটেটো

ভায়োলেট ওয়াইন

চিজকেক আইসক্রিম

ভারতীয় বংশদ্ভুত প্রফেসর শ্যাঙ্কেন এর বিরিয়ানী খুবই পছন্দ। তার স্ত্রী মায়রেন এর অবশ্য স্টেক জাতীয় খাবার বেশি পছন্দ। সাথে তারা ভায়োলেট ওয়াইন পছন্দ করে, যা হজম সহায়ক।

অল্প সময়ের মধ্যেই সব রেডি করে ফেল্লো রিকি। এবার অপেক্ষার পালা। প্রায় ঘন্টাখানিক অপেক্ষা করে রিকি আবার টেবিল পরিষ্কার করে ফেল্লো। আজও উনারা এলেন না, ভাবতে ভাবতে রিকি তার পার্সোনাল চার্জিং স্টেশানে ঢুকে গেলো। এই স্টেশনের মাধ্যমে তার ব্যাটারিটি ৯,৯৯৯ বার চার্জ দেয়া যাবে।

প্রায় একশো বছর আগে ইরিকারাহা দিবস পালন করতে গিয়েছিলেন প্রফেসর এবং তার স্ত্রী।

কর্ভাস এর সার্ভার থেকে ঠিক সেই মুহূর্তেই ইরিকারাহা দিবস সংক্রান্ত ভিডিওটি চলতে শুরু করেঃ

"এপ্সিলন গ্রুপ মানব জাতিকে সকল কাজকর্ম থেকে মুক্তি দেয়। এ উপলক্ষ কে উদযাপন করার জন্য জন্ম নেয় ইরিকারাহা দিবসের। প্রতি বছরই লক্ষ লক্ষ মানুষ লাল পোষাক পরে জমায়েত হয় সকল গুরুত্বপূর্ণ স্থানে; দিবসটিকে পূর্ণ মর্যাদায় পালন করার উদ্দেশ্য।

তবে মজার বিষয়, প্রতি বছরই একদল মানুষ ইরিকাহারা কে প্রাচীণ জাপানি রীতি হারাকিরির সাথে গুলিয়ে ফেলতে লাগে। প্রথমে এক হাজার, তারপর এক লক্ষ, এরকম করে করে কোটি কোটি মানুষ নিজেদেরকে এই দিনটিতে রক্তাক্ত করে ফেলতে শুরু করে। এভাবে আস্তে আস্তে সৌর জগতের তৃতীয় গ্রহ পৃথিবী থেকে হোমো স্যাপিয়েন্স নামক প্রাণীটি বিলুপ্ত হয়ে যায়।

অসংখ্য গণকবর তৈরি হয়, যাদের প্রতিটির উপরেই লেখা থাকে "এই মানুষটি শেষ পর্যন্ত একটি কাজ নিজে করতে পেরেছিলেন"।

এ সকল হারিয়ে যাওয়া মানুষেরা অনেকেই রেখে যায় অগাথ সম্পত্তি আর তাদের ব্যক্তিগত রোবট সমূহ। শোনা যায়, সেই রোবটদের অনেকেই, বিশেষ করে ৩০ মডেল এর আগের মডেলের রোবটগুলো এখনও নিষ্ঠার সাথে তাদের গৃহস্থালী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে--শুধুমাত্র এই আশায়, যে তাদের মনিবেরা কোন একদিন আবার ফিরে আসবে।

অবুঝ রোবট গুলো খুবই কিউট।

#ishtiaq_radical

Image: Google

Wednesday, October 23, 2019

লেনন কাহিনী



অন্য যেকোন নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানের মতই তার বড় হয়ে ওঠা ইংল্যান্ডের লিভারপুল শহরে । ব্যতিক্রম হল, শৈশবে বাবা মায়ের আদর স্নেহ না পাওয়া। বাবা আলফ্রেড আর মা জুলিয়ার ঝামেলাপূর্ণ দাম্পত্য জীবন এবং বিবিধ ভুল সিদ্ধান্তের কারণে জন তার খালা মিমির কাছেই বড় হন।

মিমি যখন জন কে শাস্তি দিতে চাইতেন, তখন তাকে অবজ্ঞা করতেন। জন যতই তার দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করতেন, মিমি ততই তার অন্যান্য কাজে বেশি করে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। এটি ছিল জনের জন্য সর্বাধিক হৃদয়বিদারক। স্নেহের জন্য বুভুক্ষু ছিল তার মন, আর অবজ্ঞার শিকার হয়ে সে খুব দ্রুতই দিশেহারা হয়ে পড়তো এবং বলতেও থাকতো 

"Don't 'nore me mimi, don't 'nore me". 

Ignore টা ঠিক মত বলতে পারতো না। শিশু কন্ঠে তা "নোর" এর মত শোনা যেত।সে কথাগুলোই হুবহু উঠে এসেছে খালা মিমির স্মৃতিচারণে।

খালার কাছে বড় হলেও জন লেনন এর জীবনে তার মায়ের অবদান কে অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। শৈশবে খালার বাসায় থাকলেও একটু বড় হবার পর মায়ের সাথে নিয়মিত দেখা হোত জন এর। কোন কোন দিন গিয়ে মায়ের বাসায় ও থাকতেন, যেখানে তার তৎকালীন পার্টনার এবং দুই মেয়ে (অর্থাৎ জন এর সৎ বোনেরা) ও থাকতেন।

জুলিয়ার বাসার বাথরুমের সামনে গিয়ে পল ম্যাকার্টনি (বিটলস এর অন্যতম সদস্য এবং জন এর বন্ধু) এবং জন গান গাওয়া ও গিটার বাজানো প্র্যাক্টিস করতেন--সেই বাথরুমে শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে নাকি লাইভ মিউজিকের মত একটি আবেশ তৈরি হোত।

জুলিয়াই জন কে তার প্রথম গিটারটি কিনে দিয়েছিলেন। তিনি তাকে উকেলেলে আর গিটার বাজানো শেখান ছোটকালেই।অনেকের মতে জুলিয়ার প্রভাবেই জন লেনন এর পরবর্তি জীবনে সংগীত প্রতিভা বিকশিত হয়।

হঠাত করে এক মর্মান্তিক সড়ক দূর্ঘটনায় মারা যান জুলিয়া। তখন জন এর বয়স মাত্র ১৮। মায়ের অকাল প্রয়াণ জন লেননের মাঝে রেখে যায় এক চিরস্থায়ী দাগ। পরবর্তী জীবনে মা কে নিয়ে উনি রচণা করেন দু'টি কালজয়ী গান; "জুলিয়া" এবং "মাদার"।

জুলিয়া গানের লিরিক্স অনেক কারণেই কালজয়ী। অনেকে ভাবেন গানটি জন এর দ্বিতীয় স্ত্রী ইয়োকো কে নিয়ে লেখা। আবার কেউ কেউ বলেন জন ইয়োকর মাঝে তার মা কেই খুজে পেতেন। জন লেনন এর জীবন এতই বৈচিত্র্যময় যে তার মৃত্যুর প্রায় অর্ধ শতাব্দী পার হয়ে যাওয়ার পরেও তাকে নিয়ে গবেষণার অন্ত নেই!

জুলিয়া গানটির দু'টি লাইন বিশেষ আগ্রহের জন্ম দেয় সবার মনেঃ

Her hair of floating sky is shimmering
Glimmering in the Sun

মেয়েদের মাথার চুলের বর্ণনা অনেক গান, লেখা ও কবিতায় উঠে এসেছে বিভিন্ন ভাবে। কিন্তু চুল কে এত সুন্দর ভাবে এর আগে কেউ বর্ণনা করেনি! 

জন লেনন ছিলেন একজন স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিভা। ছবি আঁকতেন, লিখতেন, গান কম্পোজ করতেন, লিরিক্স লিখতেন, গাইতেন, সুর দিতেন এবং বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানোয় পারদর্শী ছিলেন। উনি এবং উনার ব্যান্ড দ্যা বিটলস সংগীতে অনেক পরিবর্তন এনে দিয়েছেন। বিভিন্ন পরীক্ষামূলক বাদ্যযন্ত্র এবং ব্যাকরণ বিরুদ্ধ গান গেয়ে ও বাজিয়ে উনি একাধারে যেমন সমালচিত হয়েছিলেন, সেরকম ভাবে বহুল প্রশংসিতও হয়েছেন। বিটলস এর আগে গান গাওয়ার একটা নিয়ম ছিল। চার লাইন করে দুইটা স্ট্যাঞ্জা হবে, তারপর দুই লাইনের কোরাস--এই ব্যাকরণের বাইরে গিয়ে কেউ গান লেখার দুঃসাহসও দেখাতো না।

জন লেনন শুরু করলেন আট লাইনের স্টাঞ্জা ও চার লাইনের কোরাস দিয়ে। আবার একটা গান লিখলেন যার পুরোটাই কোরাস। এরকম উলটাপালটা, অব্যকরণিয় গান লিখেও অসম্ভব জনপ্রিয়তা পেতে থাকলো বিটলস আর ওদিকে সংগীত বোদ্ধা পন্ডিত দের সব ব্যাকরণ বই ব্যর্থ হতে থাকতো, আর তারা বসে বসে মাথার চুল ছিড়তেন!

জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকার সময় "আমরা এখন যীশু খ্রীস্টের চেয়েও বেশি জনপ্রিয়" বলে এক সপ্তাহের মধ্যে মানুষের ঘৃণার পাত্রে পরিণত হয়েছিলেন, আবার পরে ক্ষমাও চেয়েছেন এজন্য। নাইটহুড প্রাপ্তি নিয়ে করেছেন রসিকতা, আর সব সময় তাই করেছেন যা উনার নিজের পছন্দের ছিল। অন্যদের খুশি করার জন্য কখনো কিছু করেন নি।

এই কালজয়ী শিল্পীর ৭৯ তম জন্মদিন ছিল গত ৯ই অক্টোবর। মাত্র ৪০ বছর বয়সে নিজ বাড়ির সামনে আততায়ীর গুলিতে নিহত হন এই মহান শিল্পী, যিনি সব সময় মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে সবাইকে ভালোবাসায় জীবন অতিবাহিত করার মন্ত্র শেখাতেন।

শ্রদ্ধাভরে জন লেনন কে স্মরণ করি উনার জন্ম মাসে।

(লেখার তথ্য সূত্র বিভিন্ন জীবনি মূলক গ্রন্থ ও ব্যক্তি গবেষণা লব্ধ।)  

Wednesday, September 11, 2019

ডেডলাইন সেভেন ডেইজ

Deadline Seven Days

#সিনেমারগল্প৯৬৯৮ 

প্রথম হলে গিয়ে সিনেমা দেখা হয়েছিল রায়েরবাজারের মুক্তি সিনেমা হলে। ব্যাপারটা ছিল অনেকটা পারিবারিক পিকনিক এর মত। আমার নানার বাসা ছিল রায়েরবাজার হাই স্কুলের ঠিক উলটা দিকে। মামা খালা খালাতো ভাই বোন সবাই মিলে বিশাল একটি দল গিয়েছিলাম "আলি বাবা চল্লিশ চোর" দেখতে।

পুরাই পারিবারিক সিনেমা ছিল। আলীবাবার গল্প আগেই জানতাম, কিন্তু জানতাম না যে তার বড় ভাই "কাশিম বাবা" এত খারাপ ছিল। এটাও জানতাম না যে দাসী মর্জিনা এরকম শর্ট জামা পরে নাচতে নাচতে দস্যুদের দফা রফা করে দিবে। অবশ্যই গামলায় গরম তেল ঢেলে।

সে যাই হোক। এটাকে আমি প্রথম সিনেমা দেখার গল্প হিসেবে মেনে নিতে রাজী না।

ঐ ঘটনার বেশ কিছুদিন পর আমি, আমার কাজিন আর ছোট মামা--আমরা তিনজন দাবী/আব্দার জানাইলাম আরেকটি সিনেমা দেখতে যাওয়ার। উনারা কোন এক বিশেষ কারণে "ভয়ংকর সাতদিন" নামের ছবিটি দেখার জন্য বেশ উৎসাহিত ছিল। আমার তেমন কোন অভিমত ছিল না ঐ ব্যাপারে, সিনেমা হলে যাওয়ার ব্যাপারটাকে আমি সুস্থ(!) বিনোদন হিসেবেই দেখছিলাম এবং আবদারে শামিল হয়েছিলাম।

বহু অনুনয় বিনয় এবং প্রতিশ্রুতি দেয়ার পর অনুমতি এবং টিকেট কাটার জন্য প্রত্যাশিত অর্থ পাওয়া গেল। মামা সাথে ছিল দেখে আর কোন এক্সট্রা মুরুব্বী যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করে নাই। প্রতিশ্রুতি সমূহের মধ্যে ছিল সর্বদা মাগরিবের আজানের আগে বাসায় আসা, সময় মত পড়তে বসা, আউট বই না পড়া এবং সময় নষ্ট করা (এগুলার কোনটাই পরে আর মানা হয় নাই)।

সেই একই মুক্তি হলে দেখতে গেলাম "ডেড লাইন সেভেন ডেইজ" নামের দুর্ধর্ষ চলচ্চিত্রটি। হ্যা, পোস্টারে ভয়ংকর সাত দিনের নিচে ইংরেজিতে ওই তর্জমাটি দেয়া ছিল। উহা দেখিয়া আমার স্বল্প লব্ধ ইংরেজী জ্ঞান অলট পালোট হয়ে গিয়েছিল পুরাই!

সিনেমার কাহিনী সংক্ষেপ হইলো ইলিয়াস কাঞ্চন নীতিবান পুলিস আর দিতি কোন এক স্মাগলারের বোন। উনাদের প্রেম ছিল, কিন্তু তাদের আত্নীয় স্বজনের পেশার(!) কারণে তাদের প্রেম বেশিদূর গড়ায়নি। কিন্তু তারা নায়ক নায়িকা না। দিতির ছোট বোন আর ইলিয়াস কাঞ্চনের ছোট ভাই প্রেম শুরু করে। যতদূর মনে পড়ে, আকাশের দিকে তাকায় মেয়েটা কলেজের গেটের বাইরে হাটতেসিল, আর তখন গিয়ে ঐ বেটার গায়ের উপর ক্র্যাশ ল্যান্ডিং করে। তারপর একটা উদ্ভট গান শুরু হয় আর তারা নাচতে নাচতে প্রেমিক প্রেমিকায় রুপান্তরিত হয়।

এক পর্যায়ে কাহিনী সিরিয়াস হয়ে যায়। বৃত্তান্ত জানতে পেরে বুড়া বুড়ি ভেটো দেয় তাদের প্রেমে। "না না না না ...(ধুর না, এইটা কোন গানের ফার্স্ট লাইন না) এই বিয়ে হতে পারে না" বলে ইলিয়াস কাঞ্চন এক্তা চিক্কুর দিসিলো মনে আছে।

অতঃপর তাহারা পলায়ন করিয়া কোর্টে বিয়ে করতে গেলেন। কিন্তু ওখানে আবিষ্কৃত হইলো যে মেয়ের বয়স ১৭ বছর ৩৫৮ দিন--কাজী সাহেব তাহাদেরকে বলিলেন সাত দিন পরে আবার আসতে।

সেখান থেকেই শুরু হলো "ভয়ংকর সাত দিন"। সেই সাত দিনের রোমহর্ষক কাহিনী বর্ণনা করে মজা নষ্ট করবো না। ইউটিউবে মনে হয় সিনেমাটি পাওয়া যাবে খুজলে। বহুদিন আগে দেখা সেই সিনেমায় কিছু "রগরগে" সিন ছিল। সাত দিন তো আর ঘুমায় ঘুমায় কাটাবে না, নাকি? মানে ঘুমানোর আগে তো আরো অনেক কিছু করার আছে :D

হল থেকে বের হয়ে বুঝলাম যে কেন এই ছবিটাই দেখার জন্য এত উতসাহ ছিল সবার। বহুদিন আগে দেখেছি, কাহিনী কিছু এদিক ঐদিক হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু মজা ঠিকই পেয়েছিলাম, এবং নিজেকে ভাগ্যবান মনে করেছিলাম যে সাথে আর কোন মুরুব্বী আসে নাই! তাইলে নির্ঘাত পিঠে বেতের বাড়ি পরতো।

পুরনো সেই দিনের কথা...

আল্লাহ সালমান শাহ এর বিদেহী আত্মা কে শান্তি দিন।

#ishtiaq_radical

Sunday, September 08, 2019

এসবুক সমাচার

২৪২০ সাল।

না, পৃথিবী ধ্বংস হয়নি। বাংলাদেশও বেচে আছে বহাল তবিয়তে। গ্রীণ হাউজ এফেক্ট বলে কিছু আর নেই; এই শব্দটি শুধু বই পুস্তকেই পাওয়া যায়। বিজ্ঞানীদের সফল গবেষণায় মানুষের সকল দুঃখ দুর্দশা ও কাজ অনেক কমে গিয়েছে। এখন আর কাউকে হাল চাষ করতে দেখা যায় না; কৃষিপ্রধাণ বাংলাদেশ হয়ে গিয়েছে মোবাইল প্রধাণ।

বেশিরভাগ মানুষ সারাদিন মোবাইল ফোন হাতে নিয়ে বসে থাকে। গত ৫০ বছরে এক নতুন প্রযুক্তি এসেছে; এসবুক নামের একটা সাইটে সারাদিন বসে থাকলে একাউন্টে এম্নিতেই টাকা আসতে থাকে। এর সাথে যদি কেউ লেখালেখি করে আর লাইক কমেন্ট করে, তাহলে আরো বেশি টাকা আসে! এই আশ্চর্য আবিষ্কারের জন্য ফার্ক জুতারবাগ কে নোবেল, গ্র্যামি এবং পুলিতজার পুরষ্কার দেয়া হয় একইসাথে।

এই সাইট ব্যবহারের একমাত্র শর্ত হল নিজ "এস", অর্থাৎ পশ্চাতদেশ কে একটা চেয়ার কিংবা অনুরুপ কোন জায়গায় বসিয়ে রাখতে হবে। উঠে হাটাহাটি করা যাবে না। সিট ছেড়ে উঠলেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং ১০ টাকা জরিমানা হয়।

এই ধারার সাথে মিল রেখে ঢাকা শহর জুড়ে চালু হয়েছে ভ্রাম্যমাণ এস ফুড রেস্তোরা। স্বয়ংক্রিয় রোবট দ্বারা চালিত এসব রেস্তোরাঁয় সবচেয়ে জনপ্রিয় আইটেম চিজ বার্গার ও ফ্রেঞ্চ ফ্রাই। শোনা যাচ্ছে শীঘ্রই ভ্রাম্যমাণ টয়লেট ও চালু হবে, তখন আর কাউকে জরিমানা গুনে শৌচকাজ সমাধা করা লাগবে না, নিজের এস এর উপর বসে থেকেই কর্ম সারা হয়ে যাবে।

রহিম বেপারীর পূর্ব পূরুষেরা এক কালে ব্যবসা বাণিজ্যের সাথে জড়িত ছিলেন। তবে বর্তমানে এসবুক ব্যবহার ছাড়া ভদ্রলোক তেমন কিছু করেন না। উনি ২৩৪৪ সালে বিবিসি এবং ২৩৪৬ সালে সিএনএন পরীক্ষায় পাশ করেন। উনি বিসি ৪৪৪৬ নামের একটি (বিবিসির বি সিএনএন এর সি) একটি এসবুক গ্রুপের এক্টিভ সদস্য। আগে দৈনিক ১০-১২ টা "এস" এর ছবি দিতেন গ্রুপে। পরবর্তীতে লিটু নামের এক বেয়াদ্দপ এডমিন এস্ফি কে বেআইনি ঘোষণা করায় সে খুব বিপদে পড়েছে।

আরেকজন এডমিন আছে, তার নাম লোভী। এই এডমিন আসলেই লোভী। তার লোভ লালসার কারণে রহিম বেপারীর মত নম্র ভদ্র সাধারণ ইউজাররা প্রায়শই উষ্মা প্রকাশ করে বলে "এর চেয়ে নারিকেল গাছে এস বেধে আত্নহত্যা করাও বেটার"।

এসব পোস্ট দেখলেই রহিম লাইক দেয়। তার বন্ধু করিম একদিন তাকে স্মরণ করিয়ে দেয়, আরো ১০০ বছর আগেই নারিকেল নামক ফলটি বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছে, এখন বড়জোর বড়ই গাছ খুজে পেতে পারে সে। এ কথা শুনে হুহু করে কেদে উঠেছিল রহিম। সেই হুহু করে কাদার এস্ফিটাও বেরসিক লিটু ডিলিট করে দেয়।

এহেন স্বৈরাচারী অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য অনেক চিন্তা করতে থাকে রহিম। হঠাত মাথায় আসে আইডিয়া! আর্কিমিডিসের মত ইউরেকা ইউরেকা বলে নগ্ন হয়ে দৌড় দেয়ার কথা ভাবতে ভাবতে মনে পড়ে যায় তার, উঠলেই তো ১০ টাকা জরিমানা। আবার এস কে আগের জায়গায় নিয়ে যায়। ওঠার প্রয়াস নেয়ায় ২ টাকা জরিমানা হয় তার। আরেকটু দেরী হলেই পুরা ১০ টাকা গচ্চা যেত।

অনেকদিন ধরেই সে লক্ষ্য করছে যে থাকার জায়গা নিয়ে অনেকের সমস্যা। বিশেষত, অনেকেই পছন্দ করে ৪৪৪৬ বন্ধুদের কাছাকাছি থাকতে (গুর্দা ফ্রান্স বলে কথা!)। সুতরাং যারা এসস্থান নিয়ে চিন্তিত, তাদের সকল সমস্যা দূর করার জন্য নিমিষেই রহিম খুলে ফেলে নতুন একটি গ্রুপ--নাম দেয় "TOLET4446"। তার গুর্দাতালিকার সকল ফ্রান্স কে এড করে ফেলে নতুন গ্রুপে। বেশ আত্নতৃপ্তি নিয়ে সে ঘুমাতে যায় সেদিন।

সকালে ঘুম থেকে উঠতেই বমি চলে আসে তার। পুতিগন্ধময় একটা দূষিত পরিবেশ। চারপাশে গন্ধের উতস খুজতে গিয়ে টের পায় তার টেরাগ্রিন ব্র্যান্ডের মোবাইল থেকেই আসছে গন্ধ। হঠাত মনে পড়ে যায়, গত পরশু মোবাইলের স্মেল অপশনটা চালু করেছিল একটা খাবার দাবার গ্রুপে ঢোকার সময়। নব্য এই প্রযুক্তিতে যেকোন খাবারের ছবি দেখলে সেখান থেকে সেই খাবারের গন্ধও পাওয়া যায় মোবাইলের মাধ্যমে। ব্যাপারটা যে খাদ্য ছাড়া অন্যান্য জিনিসের জন্যেও কাজ করে, সেটা সে কষ্মিনকালেও ভাবেনি!

তীব্র আতংকের সাথে মোবাইল স্ক্রিণে তাকালো রহিম। গন্ধে তার দম আটকে আসছে। সে দেখলো, আবেগের আতিশয্যে TOLET না খুলে সে TOILET4446 নামের গ্রুপ খুলে ফেলেছে, আর সেখানে তার ১৬ সহস্র বন্ধুর সকলে এক রাতের মধ্যেই স্বীয় টয়লেটের ছবি মোবারক প্রদান করে রেখেছে।

জ্ঞান হারানোর আগ মুহুর্তে রহিমের শেষ চিন্তা "কেন যে গ্রুপ খুলতে গেসিলাম। আগেই ভালো ছিলাম!"।

পুনশ্চঃ সম্পূর্ণ কাল্পনিক গল্প। জীবিত কিংবা মৃত কোন ব্যক্তি বা ঘটনার সাথে কোন মিল থাকা নিতান্তই কাকতালীয়।

Monday, September 02, 2019

জাতীয় কবি

উনার ব্যাপারে আমার প্রাচীনতম স্মৃতি হচ্ছে পেপারে ছবি দেখে চিন্তা "আচ্ছা এই লোক শাড়ী পড়ে ছবি তুলসে কেন? সমস্যা কি?"। দীর্ঘদিন পর্যন্ত আমার ধারণা ছিল ভদ্রলোক শাড়ী পরেই সেই কালজয়ী ছবিটি তুলেছিলেন। লেখার সাথে সংযুক্ত ছবি দ্রষ্টব্য।

আমি দাবী করবো না যে আমি বিরাট নজরুল বোদ্ধা। সত্য বলতে গেলে, পাঠ্যবই এর বাইরে উনার লেখা খুব একটা পড়িই নাই। এবং একজনের সাথে তার "উর্দুতে" দেয়া স্ট্যাটাস নিয়ে তর্ক করতে করতে জানতে পেরেছিলাম যে "কামাল ! তু নে কামাল কিয়া ভাই !" আসলে নজরুল এর একটি কবিতার অংশ বিশেষ। 

আরো মজার ঘটনা আছে। আমাদের কৈশোরে রেনেসাঁ ব্যান্ড একটি চমৎকার এলবাম বের করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের সময় যেই গানগুলো সবাইকে উদ্দীপ্ত করেছিল, উনারা সেই গানগুলোর আধুনিকায়ন করে রিলিজ করেছিলেন "একাত্তরের রেনেসাঁ"। ক্যাসেটটি দীর্ঘদিন আমার সংগ্রহে ছিল, পরে সিডি রিলিজ হবার পর সিডিটাও কিনেছিলাম। 

সেই এলবামে ছিল "কারার ঐ লৌহ কপাট" গানটি। রেনেসাঁর কল্যাণেই কি না জানি না, গানটা শুনলেই রক্ত গরম হয়ে যেত। মনে হোত এখুনি তালা ভেংগে কাউরে জেল থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসি। দীর্ঘদিন পর্যন্ত ঐ ক্যাসেটের এই একটা গানই ছিল একমাত্র নজরুল গীতি(!) যা আমার জানা ছিল। 

অনেক বছর পরের কথা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জাতীয় কবির শেষ বিশ্রামের ঠিকানা। সেই কবর স্থানে তখন সবার অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল। ক্লাশের ফাঁকে কোনদিন সময় পেলে কবরস্থানে যেতাম। কবির কবরের অনতিদূরেই আমার দাদার কবর। উনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক ছিলেন। 

কবির কবরের সামনে অনেক বিচিত্র মানুষ দেখতাম। ভক্তকূল। একদিন এক চারণ কবির সাথে দেখা হলো। সে মুখে মুখে কবিতা বানিয়ে ফেলে, আবার খাতায় লিখে রাখে। লম্বা একটা টুপি পরে ছিল লোকটা, কিছুটা মির্জা গালিবের টুপিটার মত। কাপড় চোপড় শীর্ণ, তবে তাতে হারিয়ে যাওয়া আভিজাত্যের ছাপ রয়ে গিয়েছে। কিছুক্ষণ আনমনে খাতায় লেখালেখি করার পর চোখ তুলে আমাকে দেখলো সে। বলে উঠলো "ভাতিজা একটা কাব্য শুনবা?" বলেই উত্তরের অপেক্ষা না করে ভারিক্কি কন্ঠে শুরু করলো তার সেই বাংলা উর্দু মেশানো বিচিত্র কবিতা। দূর থেকে শুনলে মনে হবে ওয়াজ মাহফিল চলছে কোথাও। আমি কিছু না বুঝলেও মনোযোগ দিয়ে শোনার চেষ্টা করতে থাকলাম। 

তার কাব্য পাঠে বাধ সাধলো এক জোড়া কপোত কপোতী। তাদেরকে দেখেই লোকটি অসম্ভব বিরক্ত হলো, এবং কিছুটা দূরে গিয়ে বসলো। এরপর আরো এক জোড়ার আগমন, তারপর আরো--কিছুক্ষণ পর অবাক হয়ে খেয়াল করলাম যে এই কবরস্থানটি আসলে একটি সুদৃশ্য ডেটিং স্পট! 

পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয় কতৃপক্ষ সেখানে জনসাধারণের প্রবেশের উপর বিধিনিষেধ আরোপ করে; বর্তমানে পুরো জায়গাটি সারাক্ষণ তালাবদ্ধ থাকে। 

ছোটবেলায় শেখা কবিতাগুলোর মধ্যে কাঠবেড়ালী ও তার পেয়ারা খাওয়া সংক্রান্ত কবিতাটি বিশেষ স্থান দখল করে থাকবে। কারণ, অদ্যবধি ঐটাই আমার পড়া একমাত্র বাংলা কবিতা, যেখানে পেয়ারা ও কাঠবেড়ালী একই সাথে আছে।হিব্রু ভাষার একটি কবিতা পড়েছিলাম, যেখানে একটি ইহুদী খরগোস কে একটা আমেরিকান মানুষ একটি জার্মান পেয়ারা সাধে, কিন্তু সে সেটা খেতে চায় না। পরে একটা আফ্রিকান কাঠবেড়ালী এসে সেই পেয়ারা খেয়ে ফেলে। সে যাই হোক... 

আমার মনে আছে, আমি কবিতাটা শুনে আমার মা কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, "আচ্ছা মা, যেসব মহিলা বিড়াল কাঠ খায়, তাদেরকে কি কাঠাবেড়ালী বলে?"। এহেন প্রশ্ন শুনে আম্মা হেসেছিল, কেদেছিল, আবেগী হয়ে গেসিল না প্যাদানী দিসিল সেটা অবশ্য মনে নাই। তবে আজো কোথাও ঐ কবিতা শুনলে পিঠের কাছে একটা জায়গায় টনটন করে উঠে, তাই আমার ধারণা শেষ ট্রিটমেন্টটাই সম্ভবত কপালে জুটেছিল!

জাতীয় কবির প্রতি অশেষ শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে আমার এই এলেবেলে স্মৃতিচারণ শেষ করলাম। বেচে থাকুক উনার কবিতা ও গান, যুগ যুগ ধরে। 





Wednesday, August 21, 2019

জল পানি

জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালছে ও।
অবাক হয়ে অমল লক্ষ্য করলো যে জল আর পানি আসলে একই জিনিস।
একটু পরে গ্লাস পূর্ণ হয়ে গড়িয়ে পড়তে থাকলো জল ; কিন্তু চিন্তা নেই। গ্লাসের নিচেই কাসার প্লেট। প্লেটে জমতে থাকলো পানি।
আলেয়ার হাতে জগ, সে জানালা দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে বাইরে--দেখছে মেঘদলের সূর্য কে ঢেকে দেয়ার গল্প। কালো কালো মেঘ, কদাচ ভালো খবর বয়ে আনে।
একটু পরে প্লেট থেকে গড়িয়ে জলে ভেসে যেতে লাগলো মেঝে। পানির মৃদু স্রোত গড়িয়ে গড়িয়ে দরজার কাছাকাছি চলে যাওয়ার ঠিক আগে দিয়ে অর্ধছেড়া, ময়লা ত্যানা দিয়ে সে পুরো মেঝেটা মুছে ফেল্লো। জগেও আর পানি নেই। আলেয়া তখনো প্রস্তরীভূত অবস্থায়।
অমল ভাবলো, "আহা, এভাবে যদি মানুষের দুঃখ কষ্ট আর ক্লেশ কেও মুছে ফেলা যেত ময়লা ত্যানা দিয়ে!"

Monday, July 29, 2019

হুমায়ুন আহমেদ স্যার কে মনে পড়ে

আমাদের স্কুলে একটি বিশাল আকারের মিলনায়তন ছিল। আসলে খুব বেশি বড় ছিল না, কিন্তু ঐ বয়সে সেটাকেই অনেক বড় মনে হোত। এই অডিটোরিয়ামের বিশেষত্ব ছিল বাঁকানো ফ্যান। হলের দুই পাশে ওয়ালের উপর সিলিং ফ্যান লাগানো ছিল অনেকগুলো; স্ট্যান্ড বাঁকা করে পেডেস্টাল ফ্যানের মত করে লাগানো। ব্যাপারটা আসলে না দেখিয়ে বোঝানো কঠিন। সে যুগে এয়ার কন্ডিশনার লাগানো ছিল চিন্তার বাইরে, আবার এতগুলো পেডেস্টাল ফ্যানেও খরচ বেড়ে যেত অনেক--সমাধান, সিলিং ফ্যান নিয়ে এই অভিনব ব্যবস্থা! এই বিচিত্র ব্যবস্থার কল্যানে এসির মত ঠান্ডা না হলেও অডিটোরিয়ামটি বেশ ভালোই আরামদায়ক ছিল।

সে যাই হোক। আমি ঐ স্কুলে ভর্তি হই পঞ্চম শ্রেণীতে। এস এস সি পরীক্ষা দেয়া পর্যন্ত অনেক স্মৃতি। তার মাঝে বিশেষ একটি স্মৃতির কথা আজকে বলতে চাই। 

তখন বোধহয় ষষ্ঠ কি সপ্তম শ্রেণীতে পড়ি। সেসময় সারা দেশ জুড়ে শুরু হয় একটি বিশেষ প্রতিযোগিতা, যা বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র থেকে পরিচালিত হয়েছিল। 

প্রতিযোগিতার রুপরেখাটি খুবই সহজ ছিল। সব অংশগ্রহণকারীকে একটি করে বই পড়তে হবে, আর সেই বই এর উপর ভিত্তি করে কিছু প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে। আমাদের ক্লাশ টিচার জানালেন যে যে অংশ নিতে চায়, তারা যেন ক্লাশ ক্যাপ্টেন এর কাছে নাম জমা দেয়।

সেই বয়সে আমি ছিলাম বই এর পোকা। অবশ্যই গল্পের বই। সারাক্ষণ ডুবে থাকতাম সেগুলো নিয়ে, এবং প্রায়শই "আউট বই" পড়ার জন্য উত্তম মধ্যম জুটতো বাবা মায়ের কাছ থেকে।  

মনে মনে ভাবলাম, বৈধ উপায়ে যদি একটি নতুন গল্পের বই পড়া যায়, তাহলে সমস্যা কি? জমা দিলাম নাম। 

বাসায় এসে "স্কুল থেকে বলসে অংশ নিতেই হবে" জাতীয় কথাবার্তা বলে আম্মা কে বুঝালাম। আম্মা, আব্বার কাছ থেকে ছাড়পত্র আদায় করলো। ত্রিশ টাকা দিয়ে কিনলাম চার্লস ডিকেন্স এর অমর উপন্যাস "Great Expectaions" এর বংগানুবাদ, যার নাম ছিল "বড় আশা করে"। 

যেহেতু এই বই এর উপর একটা পরীক্ষা দিতে হবে, আম্মা আমাকে বাধ্য করলেন বইটি একাধিকবার পড়তে। একবার, দুইবার করে মনে হয় সাত আট বার পড়ে ফেলেছিলাম বইখানা। 

সেই বই এর প্রতিটি শব্দ যেন এখনো কানে বাজে। চোখ বুজলেই দেখতে পাই শিশু পিপ এর ক্রিসমাসের রাতে রান্নাঘর থেকে খাবার চুরি করার দৃশ্য--একটা আস্ত মুরগীর রোস্ট, মদ, বড় এক টুকরো পাউরুটি, ইত্যাদি নিয়ে সে সন্তর্পণে, পা টিপে টিপে হাটছে। একটি জগে রাখা মদ থেকে বোতলে ঢেলে নিয়ে, সেই জগে আবার পানি ঢেলে রাখা। সব কিছুই হচ্ছে অন্ধকারে। তারপর মদের বদলে ক্যাস্টর ওয়েল খেয়ে আংকেল পাম্বলচুক এর জোরে জোরে কাশি সহ বিষম খাওয়া। পরবর্তী তে এস্টেলার আগমন। থাক, আর না বলি। 

পরীক্ষার অল্প কিছুদিন আগে জানলাম যে স্কুল পর্যায়ের বিজয়ীরা জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতার দ্বিতীয় পর্বে অংশগ্রহণ করতে পারবে। সেখানে বিষয়বস্তু থাকবে "বাংলা সাহিত্য"। কিন্তু চমক এখানেই শেষ না, আমার প্রধান শিক্ষক এসেম্বলি তে ঘোষণা দিলেন যে নন্দিত ঔপন্যাসিক হুমায়ুন আহমেদ স্যার স্কুল পর্যায়ে জয়ী হওয়া তিন জনকে আমাদের সুবিশাল অডিটোরিয়ামে নিজ হাতে পুরষ্কার তুলে দিবেন। 

জাতীয় পর্যায়ের প্রতিযোগিতা নিয়ে যদি আমার উচ্ছাস থাকে ১০ এ ৮, তাহলে হুমায়ুন আহমেদ স্যার কে স্বচক্ষে দেখা নিয়ে আমার উচ্ছাস ছিল ১০ এ ৩০! মনে মনে ঠিক করেছিলাম যে যদি জিততে নাও পারি, তাহলে অবশ্যই অন্তত উনাকে দেখার জন্য প্রথম সারিতে জায়গা নেয়ার চেষ্টা করবো। 

যেদিন পরীক্ষার ফল ঘোষিত হল, নিজের চোখ কে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি কিভাবে জানি দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে ফেললাম। 

দেখতে দেখতে সেই স্বপ্নের দিন চলে এলো কাছে। মনে মনে অনেক ভেবে রেখেছিলাম যে স্যার কে জিজ্ঞেস করবোঃ

ফিহা কেন মারা গেলেন? উনাকে না মেরে চতুর্মাত্রিক সময় সমীকরণের সমাধান টা কোন ভাবে করা যেতো না?
বোতল ভুত বলে কি আসলেও কিছু আছে?
হিমু কি আসলে আপনি নিজেই?
মিসির আলীর জীবনের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ কোনটা? 

হেড স্যার মাইকে আমার নামটা ডাকলেন, আর আমি দৌড়ানো আর হাটার মাঝামাঝি একটা পদ্ধতির মাধ্যমে স্টেজে উঠে গেলাম। চারদিক থেকে বন্ধুরা হাত তালি দিচ্ছিলো, দুই একজন পিঠও চাপড়ে দিলো, কিছুই আমি খেয়াল করছিলাম না। কেমন জানি একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলাম। 

খুব ভয়ে ভয়ে উনার হাত থেকে ক্রেস্ট টা নিলাম। কিছু ছবি উঠলো। 

তারপর দেখি উনি মিটিমিটি হাসছেন। উনার সেই ট্রেডমার্ক হাসি। মোটা কাচের চশমার আড়ালে লুকনো গাম্ভীর্য। হাসি দেখে ভরসা পেলাম। হাত মেলানোর জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম। খুব মোলায়েম হাতের ছোয়া। মনে যা প্রশ্ন ছিল সব ভুলে কিছু না বলেই ফিরে এলাম নিজের জায়গায়।
  
গতকাল ছিল শ্রদ্ধেয় হুমায়ুন আহমেদ স্যার এর প্রয়াণ দিবস। উনি লেখক হিসেবে সমালোচকদের কাছে প্রিয় হতে পারেন নি, অনেক বোদ্ধা উনাকে সাহিত্যিক বলতেও নারাজ। কেউ কেউ এমনও বলেন যে হুমায়ুন আহমেদ এর কারণে নাকি একটা জেনারেশন বই পড়া শিখেনি। 

আমি এইসব নিন্দুক দের বিশুদ্ধ্ব মুড়ি খাওয়ার আমন্ত্রণ জানাই। ভালো থাকুক প্রিয় লেখক, যেখানেই আছেন। আপনার কারণেই আজকে আমরা পাঠক, লেখক। অনেক শ্রদ্ধা আপনার উদ্দেশ্যে। 

Tuesday, May 21, 2019

তোমার বন্ধু রাশেদ পর্ব ২

তোমার বন্ধু রাশেদঃ পর্ব ২

ভাই, আপনি কয়দিন ধরে পাঠাও চালান?
এই তো স্যার, দুই তিন মাস হইলো।
বাইক চালিয়ে মজা পান?

মজার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে একটা হালাল উপার্জনের পথ পাইসি স্যার, এইডাই আসল।
রাস্তা দিয়ে এই যে এত্ত এত্ত মানুষ হেটে যায়, কাউরে দেখলে বাইক দিয়ে চাপা দিতে ইচ্ছা করে না আপনার?

এ পর্যায়ে চমকে উঠে পাঠাও চালক হাসান হার্ড ব্রেক কষলো। রাশেদ প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়তে গিয়েও নিজেকে শেষ মুহূর্তে সামলে নিলো। আবার ঠিক মত বসে, সে হাসান এর কানের কাছে মুখ নিয়ে মৃদু স্বরে বল্লো "আমার তো প্রায়ই রাস্তা ঘাটের বেকুব পথচারী দের চাপা দিতে ইচ্ছা করে। ছাগলের মত দৌড় দেয়, ডান বাম দেখে না। এদের মরাই উচিৎ।"

এ কারণেই আসলে রাশেদ গাড়ী নিয়ে বের হয় না। স্টিয়ারিং হাতে নিলেই মনের পশুটা বন থেকে পালিয়ে শহরে চলে আসে। ইচ্ছে করে গ্র্যান্ড থেফট অটো গেমের মত বেপরোয়া স্টাইলে গাড়ী চালাতে।

হাসান মনে মনে আয়াতুল কুরসী পড়ছে। সে কষ্মিনকালেও ভাবেনি এরকম উদ্ভট এক যাত্রী তার বাইকে চড়বে। আজ প্রায় বছর খানিক হলো সে রাইড শেয়ারিং সার্ভিসে বাইক চালাচ্ছে। কেউ জিজ্ঞেস করলে কমিয়ে বলে, তাতে অনেকের মায়া হয়, কিছু টাকা বেশি দেয়। তবে আজকে সে শুধু তার প্রাপ্য ন্যুনতম সম্মানী টা পেলেই বর্তে যাবে, আর সাথে পৈত্রিক প্রাণটা অক্ষত থাকলে তো কথাই নেই।

হঠাত রাশেদ তার পিঠ স্পর্শ করলো দুই হাতে। অবশ্যই এটি কোন "অন্যরকম" ছোয়া ছিল না; রাশেদের পক্ষ থেকে এ যেন এক ভ্রাতৃত্ববোধ কে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান। কিন্তু সেই ছোয়াতেই হাসানের আত্নারাম খাচাছাড়া হয়ে গেলো। ঢোক গিলে সে একবার পেছনে ফিরে তাকালো।

রাশেদের মুখে মিটিমিটি হাসি। যেন বহুদিন ধরে চেনে হাসান কে। মানুষটা কি পাগল? মনে মনে ভাবে হাসান।
"হাসান সাহেব
জ্বী বস! (স্যার কখন বস হয়ে গেলো সেটা হাসান একেবারেই খেয়াল করেনি))
আমার কথা সিরিয়াস্লি নিবা না, বুঝলা? রাস্তাঘাটে সাবধানে চালাবা। পথচারী যত বোকাই হোক না কেন, তাকে সম্মান করবা। মনে রাখবা, একটি পথচারীর গায়ে আঁচড়, পাঠাও ড্রাইভারের সারা জীবনের কান্না। পাব্লিক এমন পিটুনি দেবে যে তুমি তোমার পিতৃদেব এর নাম ভুলে যাবা।
জ্বী জী বস। মনে থাকবে।
কিছুক্ষণ পর ভয়ে ভয়ে সে সুধায়ঃ
বস, একটা কথা জিগাই?
হু, বলো।
আপনি কি কোন পীর ফকির? আমারে একটু দোয়া কইরা দিয়েন। এত পরিশ্রম করি, তাও টাকা পয়সা হয় না।
ধুর পাগলা, আমি পীর হইতে জামু কোন দুঃখে?
না বস, আপনি এক্টূ দোয়া দেন।
আচ্ছা যা, তোর ভালো হবে।

হাসান খুশি মনে বাকি রাস্তা চালিয়ে নিয়ে গেলো। নান্নার বিরানীর পাশে নেমে গেলো রাশেদ। দুইশো টাকার ভাড়া দিতে গিয়ে অন্যমনষ্ক হয়ে দুইটা এক হাজার টাকার নোট দিয়ে চলে যাচ্ছিল ও। হাসান পেছন থেকে জোরে ডাক দিলো "বস, বস। ভাংতি নিয়া যান। আপনি ভুলে ২ হাজার টাকা দিসেন"

রাশেদ শুনেও শুনলো না। দ্রুত পাশের গলিতে ঢুকে গেলো। দূর থেকে তার চলে যাওয়া দেখে হাসান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো। অন্তত, তার কাছে রাশেদ এর নাম্বারটি রয়েছে। ভাবলো পরে কোন এক সময় টাকাটা তাকে পাঠানোর ব্যবস্থা করবে।

নতুন মডেল এর এলিয়ন গাড়ীটা কিনতে কামাল এর বেশ বড় সড় একটা লোন নিতে হয়েছে। তবে তার মোটা বেতন আর হাঁকডাক দেখে ব্যাংক কর্মকর্তাগণ দ্বিধা করেনি বললেই চলে। লোন স্যাংশান হতেও লাগে মাত্র সপ্তাহখানিক এর মত। ওকে ব্যাংকেও যেতে হয়নি; একজন অফিসার এসে তার অফিস রুমে বসেই সকল ফর্ম পূরণ করে শুধু তার স্বাক্ষর নিয়েছিল বেশ কয়েক জায়গায়। সব কাগুজে কাজ শেষ হবার পর খলিল নামের অফিসারটি একটা প্রস্ন করে ওঠেঃ
"স্যার, গ্যারান্টর কে হবেন?
হাহ?
জ্বী স্যার, একজন গ্যারান্টরের নাম লাগবে, এবং তার পদবী ও স্বাক্ষর।
গ্যারান্টর এর কাজ কি?
হেহে করে মৃদু একটা হাসি দিয়ে খলিল উত্তর দিলো, এটা আসলে কিছু না স্যার। একটি ফর্মালিটি।
না আপনি খোলাসা করে বলুন। ব্যাংকার আর আইনজীবিদের আমি এক বিন্দুও বিশ্বাস করি না।
মানে হল কোন কারণে আপনি যদি লোন পরিশোধ করতে ব্যর্থ হন, তবে ইনি আপনার পক্ষ থেকে সেই লোনের জন্য দায়বদ্ধ হবেন।

হাহাহা করে হেসে উঠলো কামাল। এক্টুও দ্বিধা না করে বল্লো "ঠিক আছে, রাশেদ ভাই হবেন আমার গ্যারান্টর।"
রাশেদ কে এক কথা বলার পর সেও বেশ কিছুক্ষণ হেসেছিলো। বল্লো"কামাল তুই আমাকে কিসে ফাসাচ্ছিস বল তো? না হয় পার্কার কলমটি দেই নি সেদিন, তাই বলে আমাকে এরকম বিপদে ফেলবি?"
এ পর্যায়ে কামাল এর চিন্তার সূত্র ছিন্ন হয় ড্রাইভের গালিগালাজ আর হর্ণ এর তীব্র শব্দে। সামনে নাকি হঠাত করে এক বাইক চালক ব্রেক কষেছে কোন ধরণের সংকেত না দিয়েই। আরেকটু হলেই ঘটে যেতে পারতো মারাত্নক দূর্ঘটনা। মিজান সমানে গালি দিয়েই যাচ্ছে।
কামাল বিরক্ত হয়ে মিজান কে থামতে বল্লো। সে থামলেও গজগজ করতে লাগলো।
সামনে ট্রাফিক পরিস্থিতি বোঝার জন্য বুক পকেট থেকে মোবাইল ফোনটি বের করলো কামাল। বের করতে গিয়ে বুক পকেটে সেই পার্কার কলমটির অস্তিত্ব টের পেলো । অনেক শখের কলমটি। সেদিন না দিলেও কিছুদিনের মধ্যেই রাশেদ তাকে কলমটি দিয়ে দিয়েছিল। আর সে গ্যারান্টরও হয়েছিল কার লোনের।
ভাবতে ভাবতে আবার উদাস হয়ে গেলো কামাল। আকাশের দিকে তাকিয়ে হঠাত উপলদ্ধি করলো যে অনেক সাদা মেঘ দেখা যাচ্ছে। আজকেও মনে হয় ইফতারটা রাস্তায় করা লাগবে।
(চলবে)

Friday, May 17, 2019

তোমার বন্ধু রাশেদ পর্ব ১

[অনেক দিন পর লিখলাম]


অনেকক্ষণ ধরে ট্রাফিক জ্যামে আটকা রাশেদ। অফিস থেকে বের হবার সময় এই ভয়টাই পেয়েছিল। ঠিক ৩ঃ৩০ এ বের হতে পারলে এই ঝামেলাটা সহজেই এড়ানো যায়। কিন্তু কোন মতে ঘড়ির কাটা ৪ঃ৩০ পেরুলেই সব হিসাব পালটে যায়। পাঠাও কিংবা উবার, রিকশা কিংবা প্রাইভেট কার--কোনটাতে চড়েই জ্যাম এর হাত থেকে বাচা যায় না।

সেদিন ছিল মঙ্গলবার। নাম ছাড়া এই দিনের মধ্যে মঙ্গলের কিছুই খুঁজে পায় না রাশেদ। সপ্তাহের ঠিক মধ্যখানে এই বেরসিক দিনের বসবাস। এদিন সাপ্তাহিক সেলস টার্গেট এর ৬০% ও কেন পূরণ হয় নি সে চিন্তায় বসের মাথা থাকে গরম, যার মানে হচ্ছে সকাল ৭টা থেকেই ফোনের পর ফোন আর বাজখাই কন্ঠের হাঁকডাক সহ্য করতে করতে অফিসে যেতে হয়।

শুধু বসের সকালের কলগুলো ধরার জন্যেই একটি ব্লুটুথ হেডপিস কিনেছিল রাশেদ। প্রতিদিন তাকে অনেক আগে বাসা থেকে বের হতে হয়; বেচারাম দেউড়ি থেকে সাইকেল চালিয়ে গুলশানে এসে অফিস করা চাট্টিখানি কথা নয়!

আজকে বৃষ্টি বৃষ্টি ভাব দেখে সকালে সাইকেল নিয়ে বের হয়নি রাশেদ। পাঠাও দিয়ে এসেছে। এখন ফেরার সময়ে অনেক্ষন খুঁজে পাঠাও না পেয়ে উবার মোটোর শরণাপন্ন হতে হয়েছে ওকে। এই রোজায় একদিনও বাসায় ইফতার করা হয়নি। আজকে কি মনে করে জানি বস সাড়ে তিনটার দিকে সবাইকে ডেকে বললেন "যাদের কাজ শেষ, তারা সবাই বাসায় চলে যাও"। বলে নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে নিচু, কিন্তু পরিষ্কার কন্ঠে রাশেদ কে বললেন "সেলস ফোরকাস্ট টা নিয়ে রুমে আসো"।

এরপরের এক ঘন্টা কেটে গেল শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে টিস্যু দিয়ে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে আর ল্যাপটপে নোট নিতে নিতে। আবারও বসের মাথায় সেই হকারের পোকা এসেছে! উনি চান লেভিওসা প্লাস ক্যাপসুলটি সংবাদপত্র স্ট্যান্ড আর হকার মারফত ঘরে ঘরে বিক্রী করতে। দু'বছর আগে উদ্ভাবিত এই ঔষধটিই এখনো রেইফেল ফার্মা কে এখনো টিকিয়ে রেখেছে বাজারে। এ এমন ওষূধ যা ড্রাগস না হয়েও মানুষকে আকাশে উড়ে যাওয়ার অনুভূতি দিতে পারে। মার্কেটিং টিম বলেছিল বিজ্ঞাপনে "লেভিওসা প্লাস--আপ্নাকে দেয় উড়ে যাওয়ার জন্য পাখা", এই ট্যাগ লাইনটি ব্যবহার করতে।

কিন্তু তারা ভুলে গিয়েছিল যে এই একই বাণী সহকারে বিক্রয় করতে গিয়ে গত দশকে একটি স্বনামধন্য এনার্জি ড্রিংক নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ছয় মাসের মধ্যে কপর্দকহীন হয়ে গিয়েছিল। তড়িঘড়ি করে অন্য প্ল্যানে এগুলো মার্কেটিং টিম, খুঁজে পেল হরিপদ দা কে, আর বাকিটা ইতিহাস।

সেই থেকে রাশেদ খালি এই জিনিসই বিক্রী করে যাচ্ছে; দেশে, বিদেশে। ওর ধারণা সে বেশ কর্মঠ। মানুষ হিসেবেও তার জুড়ি মেলা ভার। সে সবার সাথে হাসি মুখে কথা বলে, এবং সাধ্যমত গরীব দূঃখী দের সাহায্য করার চেষ্টা করে।

প্রায়ই সে সেলস টার্গেট এর চেয়ে বেশি বিক্রী করে, কিন্তু খুশি না হয়ে তার সহকর্মীরা তার উপর বিরক্ত হয়। আড়ালে তাকে অনেকেই কলুর বলদ বলে ডাকে, এ কথাটা সে জেনেও না জানার ভান করে। রাশেদ ইদানিং খেয়াল করছে যে সে স্মোকিং রুমে ঢুকলেই সবার কথা বন্ধ হয়ে যায়। অনেকেই তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে যায়, আর যারা অর্ধসমাপ্ত ধুম্রশলাকার মায়া ত্যাগ করতে পারে না, তারা চরম অস্বস্তি সহকারে তাকে যথা সম্ভব অবজ্ঞা করে দ্রুত, এবং লম্বা লম্বা টান দিতে থাকে তাদের বেনসন লাইটস আর ডানহিল সুইচ এ। এইতো সেদিনও লাইটার নিতে ভুলে গিয়েছিল রাশেদ। তখন সহকর্মী কামাল এর কাছে আগুন চাইতে সে যেন শুনলোই না তার কথা। দুই তিন বার ডেকে ব্যর্থ হয়ে অগত্যা সে আবার ডেস্কে ফিরে লাইটার নিয়ে এসেছিল।

অথচ এই কামালকে সেই এখানে চাকুরীটা দিয়েছে বলা যায়। ইন্টার্ভিউ বোর্ডের সিংহভাগ মানুষ কামাল কে নেয়ার পক্ষে ছিল না। তাদের যুক্তি, কামাল অত্যধিক নিরীহ; সেলস এর জব এর জন্য সে প্রস্তুত নয়। কিন্তু রাশেদ এর জোরাজুরিতে সবাই শেষ পর্যন্ত রাজি হ ইয়কামালকে সুযোগ দিতে।

বছর দুয়েকের মধ্যেই সবার ধারণা কে ভুল প্রমাণ করে কামাল এতটাই উন্নতি করে যে তাকে রাশেদ এর ডিপার্টমেন্ট থেকে ট্রান্সফার করে তাকে আলাদা ডিপার্টমেন্ট এ বস হিসেবে নিয়োগ দেয় কোম্পানী।

হ্যা, কামাল আমার বন্ধুই ছিল, ভাবলো রাশেদ। দুই জনের বয়সের পার্থক্য মাত্র দুই বছরের। শুরুতে গুরু শিষ্যের সম্পর্ক থাকলেও আস্তে আস্তে তা মোড় নেয় বন্ধুত্বের দিকে। এরপর এক সময় শিষ্য, গুরুকে ছাড়িয়ে যায়। বাড়তে থাকে দূরত্ব। আগে সারাদিন যার সাথে কথা ও আড্ডা হোত, আজকাল মাসেও একবার তার সাথে কথা হয় কি না সন্দেহ। একটা লম্বা দীর্ঘঃশাস ফেলে নিজের ডেস্ক থেকে ব্যাগ নিয়ে অফিস থেকে বের হলো রাশেদ। একবারও খেয়াল করলো না যে কামাল তার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে।



জান, আজকে অফিস কেমন গেলো?
বেবি, অফিস ভালোই গিয়েছে। কিন্তু মনটা খারাপ।
কেন?
রাশেদ, জাস্ট রাশেদ।
তোমার বন্ধু রাশেদ?
হ্যা।
কেন, তার কি হয়েছে?
আর বলো না। এত ব্রিলিয়ান্ট একটা মানুষ। দেখতে দেখতে ধ্বংস হয়ে গেলো, চোখের সামনে। আজকাল ভাবতেও অবাক লাগে যে আমার আজকের এই সাফল্যের পেছনে এই মানুষটার এত অবদান।

মানে কি?
সে একটা র্যান্ডম!
কিরকম?
কিছু মনে রাখতে পারে না। বাসায় চকচকে নিশান গাড়ী রেখে সাইকেল নিয়ে অফিসে চলে আসে। কোন কোন দিন বৃষ্টির মধ্যেও পাঠাও তে চড়ে, কাক ভেজা হয়ে আসে। কাপড় চোপড়েরও কোন ঠিক থাকে না। সেদিন অফিসের পিয়নদের মত সেজে চলে এসেছে! আবার আরেকদিন স্পঞ্জের স্যান্ডেল পড়ে চলে আসলো।

তার মানে কি রাশেদ ভাই পাগল হয়ে গিয়েছে?
ঠিক তা না! উনার অবস্থা সিড ব্যারেট এর মত। মাথা পুরো এলোমেলো, কিন্তু যখন হঠাত করে একটা কাজ পছন্দ হয়ে যায়, সেটা কিভাবে কিভাবে জানি করে ফেলে। আর সেই কাজের ফল উপভোগ করি আমরা, বাকিরা। সারা বছর যতই ঝামেলা করুক না কেন, ওই এক মূহুর্তের উদ্ভাবনী শক্তির অপেক্ষায় মালিক পক্ষ তাকে কখনোই কিছু বলে না। হয়তো কোন একদিন উলঙ্গ হয়ে অফিসে আসবে, কিংবা ট্রাফিক কন্ট্রোল করতে বের হবে, সেদিন সবার টনক নড়বে!

কিন্তু উনার এই অবস্থা হলো কেনো?
কাজের চাপে, ডিয়ার। বছরের পর বছর ১৪ ঘন্টা করে দৈনিক অফিস করেছে, সে তুলনায় প্রমোশন বা ইনক্রিমেন্ট কিছুই পায়নি। এক সময় এই হতাশা থেকেই সে উদ্ভট আচরণ শুরু করে।

তুমি রেইফেল সাহেব কে মেইল করে জানাও এই অবস্থা। এরকম একটা পাগল কে অফিসে কিভাবে রেখেছ তোমরা? কোনদিন হয়তো রেগে গেলে পেপারওয়েট ছুড়ে মারবে কারও মাথায়, টাকিলা জলিল ভাই এর মত।

হাহাহা, তোমার মনে আছে সেই গল্প?
কিভাবে ভুলি! "কে আমার কলম চুরি করেছে?" বলতে বলতে হঠাত ছুড়ে মেরেছিল পেপারওয়েটটি, তার সহকর্মীর দিকে। সহকর্মী স্টিলের প্লেট কে ক্যাপ্টেন এমেরিকার ঢালের মত ব্যবহার করে নিজের খুলি বাঁচিয়েছিল!

হাহা, না। রাশেদ এরকম না।
তোমার বন্ধু রাশেদ, তাই এ কথা বলছো। তোমরা উনার চিকিৎসার ব্যবস্থা কর।

কামাল অন্যমনষ্ক হয়ে গেলো। বিদায় জানিয়ে ফোনটা রেখে দিলো। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলো রাশেদ একটা খুবই পুরনো ধাঁচের রয়েল এনফিল্ড বাইকে বসে আছে; তার সামনে কিঞ্চিত ভিত সন্ত্রস্ত পাঠাও ড্রাইভার। জানালা খুলে রাশেদ কে ডাকতে গিয়েও ডাকলো না কামাল।

(চলবে)