Tuesday, March 13, 2018

If I Can Make it Here, I can make it Anywhere

[আজকে গল্প পোস্ট করার জন্য সেরা দিন নয়, কিন্তু মন টা অনেক খারাপ, লেখালেখি করেই সেই মন খারাপ ভাব দূর করার চেষ্টা। বেশ কিছুদিন আগে লিখে রাখা ড্রাফট শেষ করলাম আজ। আশা করি ভাল লাগবে।]

If I Can Make it Here, I Can Make it Anywhere

আজ নতুন করে শুরু করবো সব কিছু।

ফ্র্যাঙ্ক সিনাত্রা বলেছিলেন যদি "যদি নিউইয়র্কে কিছু হতে পার, দুনিয়ার যেকোন জায়গায় হতে পারবে"

গুনগুন করে ক্লাসিক গান টার সুর ভাঁজতে ভাঁজতে এগিয়ে গেলাম জানালার দিকে।আজকের সূর্য্য টা অন্যদিনের চেয়ে বেশি উজ্জ্বল মনে হচ্ছে। মোবাইলের এপ এ দেখলাম তাপমাত্রা ২৫-৩০ ডিগ্রির মধ্যে থাকবে।

কাঠ ফাটা রোদের মধ্যে বের হলাম হাফ প্যান্ট, হাওয়াই শার্ট আর ফেডোরা হ্যাট চাপিয়ে। খুবই বিচিত্র পোষাক, নিঃসন্দেহে। কিন্তু মন আজ ফুরফুরা আর পকেট ডলারে ভর্তি।

কিন্তু মানুষ ভাবে এক, হয় আরেক। বাদ সাধলেন সুয্যি মামা। ডিউটির মাঝে ফাঁকি মেরেছেন উনি। উনার নির্দয় অনুপস্থিতিতে বেরসিক মেঘ এসে ভিজিয়ে দিয়ে গেল সর্বাংগ, মূহুর্তের মধ্যেই।

এতই বিরক্ত হলাম যে রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে মেঘের দিকে তর্জনী উচা করে কিছুক্ষণ সূর্য্য কে অভিসম্পাত করলাম। এর পর হঠাত আনমনা হয়ে গেলাম।

ওয়াও নিউ ইয়র্ক! কে জানতো এত দ্রুত আমার ভাগ্য ফিরবে। ছোট একটা ব্যবসায় কিছু টাকা লগ্নী করেছিলাম। এক মাসের মাথায় সে টাকা ১০ গুণ হয়ে ফিরে এল। পরের মাসে ইনভেস্টমেন্ট দ্বিগুণ করে দিলাম। আর পিছু ফিরে তাকাতে হয়নি। "ডার্টি নিগার" রা ড্রাগ খেয়ে খেয়ে, নিজেরা মারামারি করে মরুক, আমার কি?

প্রথম প্রথম খুব খারাপ লাগতো। লিটন ছিল আমার প্রিয় বন্ধু, নির্দ্বিধায় বিশ্বাস করতো আমাকে। এমন কি, আমি যেদিন "হেলথ চেক আপ" এর জন্য "মালয়েশিয়া" যাওয়ার কথা বলে প্লেনে উঠে গেলাম, সেদিনও কিছু সন্দেহ করে নাই সে। ড্রপ করে দিয়ে গিয়েছে এয়ারপোর্টে তার জীর্ণ টয়োটা স্টারলেট গাড়ীতে চড়িয়ে। বাবা মা কে কোনদিন চেনার সুযোগ হয় নি, আত্নীয়, বন্ধু, বেস্ট ফ্রেন্ড--সব কিছুই ছিল লিটন।

নিউ ইয়র্কে এসে মেরে দেয়া ৮০ লাখ টাকা ওড়াতে খুব বেশি সময় লাগে নাই। একবারও মনে পড়ে নাই লিটনের কথা। ৭ দিনের লাস ভেগাস ট্রিপ প্রায় নিঃশেষিত করে দিল আমাকে, সব দিক দিয়ে।

এরপরই বাকি টাকা দিয়ে ড্রাগ ব্যবসায় নামলাম। নিগ্রো দের প্রিয় কোকেইনের ব্যবসা, পুরাটাই লাভ। ওরা খেয়ে খেয়ে মরুক, তাতে আমার কি? এই ভেবে নিজেকে সান্তনা দিতাম। লিটনের শেয়ার বাজারের উদ্ভট ব্যবসার চেয়ে অনেক ভাল।

আচ্ছা, লিটন কেমন আছে? ও কি ভেবেছে যখন জানতে পেরেছে ওর প্রিয় বন্ধু তার সারা জীবনের সব সঞ্চয় মেরে দিয়ে ভেগে গিয়েছে? কাউকে কি বলতে পেরেছে দুঃখের কথা? নাকি দুঃখে হার্ট এটাকই করে বসলো সে! নাহ, আর ভাবতে চাই না।

আর দেরী নয়। নতুন দিন অপেক্ষা করছে, এভাবে আর রাস্তার মাঝে দাঁড়িয়ে থেকে সময় নষ্ট করার কোন মানে হয় না। সামনে আগাতে গিয়ে ধাক্কা খেলাম জোরে।

মাটিতে পড়ে আছে নিউইয়র্ক টাইমস এর একটি কপি। হাতে নিলাম পেপার।

বিস্ফোরিত চোখে দেখলাম একজন মাঝারী আকারের মানুষের ছবি। পরনে হাফ প্যান্ট, নীল হলুদ হাওয়াই শার্ট। আর যেখানে মাথা থাকার কথা, সেখানে থেতলানো, ছিন্ন ভিন্ন মাংশপিন্ড। পাশে আশ্চর্যজনক ভাবে পড়ে আছে একটি অক্ষত ফেডোরা হ্যাট; একদম ইন্ডিয়ানা জোন্স এর টুপিটার মত।

হঠাত মনে পড়ে গেল কিছু দৃশ্য। আকাশের দিকে তর্জনী উত্তোলন। অনেক মানুষের আর্তচিতকার। কর্কশ হর্ণের শব্দ। হলুদ, চোখ ধাধানো আলো। তারপর আর তেমন কিছু মনে নেই।

এই স্বপ্নটা প্রতিদিনই দেখি আমি। মনে হয় আজকেই সেই দিন, যেদিন সব কিছু বদলে দিব। কিন্তু কিছু করতে পারি না, বলতেও পারি না।

নিউইয়র্কে না, দুনিয়ার কোন খানেই আর কোনদিন, কোনকিছু হতে পারবো না আমি। এই বয়ামের ঢাকনাও আর খুলবে না, যেখানে আমার মস্তিষ্ক সংরক্ষিত আছে অজানা কোন এক তরলে ডুবন্ত অবস্থায়।

আমাকে ক্ষমা করে দিস লিটন।

#ishtiaq_radical

Sunday, March 11, 2018

ফাগুন এর খেতা পুড়ি

"ফাগুন এর খেতা পুড়ি"
সেই ছেলেটি হতে চেয়েছিল খাপছাড়া, লাগামহীন। সবাই যখন মেটালিকা মেগাডেথ নিয়ে মেতে আছে, ও আটকে ছিল রবীন্দ্রনাথ, শিরোনামহীন আর দলছুট কে নিয়ে। গান ছাড়া কোন নেশা ছিল না, কিন্তু উসকো খুসকো চুল, দুর্বিনিত দাড়ী আর রাত জাগা ঢূলু ঢূলু চোখের কারণে সবাই ওকে মনে করতো নেশাগ্রস্থ। বিলাসবহুল সেডান গাড়ী তে চলাফেরা আর বহুতল ভবনের লিফটে ওঠা নামা প্রতিদিন; অবস্থাপন্ন পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান হয়ে জীবনে ছিল না প্রাচুর্য্যের অভাব।
ফেব্রুয়ারীর সুদর্শন আবহাওয়া ঘুমের রুটিনে আনতে পারেনি কোন পরিবর্তন। সারাদিন বাইরে ঘুরে, বাসায় ফিরে অল্প কিছু খেয়েই বসে যেত গান আর গিটারের চর্চায়। গভীর রাত পর্যন্ত চলতো গিটার ও গলার সাথে রোমান্স।

কখনো কখনো বারান্দায় গিয়ে সিগারেটে দুই টান, নিজ হাতে বানানো ধুমায়িত কফির কাপে দুই চুমুক, সাদা কাগজে দুই কলম কবিতা কিংবা গদ্য। পরীক্ষা থাকলে কিঞ্চিত পড়াশোনা করার ব্যর্থ চেষ্টা।

জীবনের এ সব কিছু সুখকর মূহুর্তের সমন্বয় এনে দিত নিরবিচ্ছিন্ন এক উপলদ্ধি, "জীবন টা খুব এক টা খারাপ না।"

হঠাত কোন একদিন উদাস হয়ে আশে পাশে তাকানো। যেদিকে চোখ যায়, অট্টালিকা আর দালান, ইট পাথরের সভ্যতা। মাঝে হাল্কা সবুজের ছোয়া, দু'টি তাল গাছ আর কিছু ঝোপঝাড় আর হঠাত করে চোখে পড়ে যাওয়া পাশের বারান্দার কোন অজ্ঞাত, পলায়নপর মানুষের হলুদ পোষাকের ঝাপসা অবয়ব।

তাঞ্জির বুঝতো যে কেউ তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে। সেই কেউ টার সেন্স কেউটে সাপের চেয়েও প্রখর ছিল। যখনই ওদিকে মাথা ফেরাতো, সাঁই করে ১০০ মিটার দৌড় প্রতিযোগীর ক্ষিপ্রতায় ভেগে যেত অজ্ঞাত সে জনা। কয়েকদিন ভেবেছে পাশের ফ্ল্যাটে বেল বাজাবে, নক করবে দরজায়, যদি সে খুলে দেয় দরজা! কিন্তু পরক্ষণেই বাতিল করে দিয়েছে সে চিন্তা। আবার মেতে উঠেছে গান বাজনা আর ধুম্র শলাকা নিয়ে।

গলা ছেড়ে গান গাইত ও। বন্ধু মহলে ওর গান খুবই জনপ্রিয় ছিল, ওকে ছাড়া আড্ডা জমতোই না। দূর পাহাড় কিংবা সমুদ্র তট, বন্ধুরা মিলে যেখানেই যাক না কেন, তাঞ্জির কে গান গাইতে হোত। সেই অভ্যাস বসে নিজের ঘরে বসেও গান গাইত জোরে জোরে, কিন্তু শক্ত কাঠের দরজা ভেদ করে বাসার ভেতরে যেত না সেই সুর। তবে পাশের বারান্দার কথা আলাদা।

একদিন লিফটে ঢুকেছে তাঞ্জির; ক্লাস শুরু হবে আর ২ ঘন্টা পরেই। গুন গুন করে "তারায় তারায় রটিয়ে দেব" গাইতে গাইতে খেয়াল করেনি যে লিফট উপরে যাচ্ছে। উপরে গেল, দরজাও খুলে গেল, কিন্তু কেউ লিফটে ঢুকলো না। মনে মনে অভিসম্পাত করলো সে ১৬ তলার বাসিন্দাদের।

১৬ তলা থেকে লিফট আবার ৭ এ এসে থামলো। লিফট এর কপাট খুলতেই একজোড়া মায়াবী চোখ তাঞ্জির কে ব্যবচ্ছেদ করতে করতে লিফটে প্রবেশ করলো। বোরখা, হিজাব ও নেকাব পরিহীতা ছিপছিপে গড়নের "পিচ্চি" টা তার দিকে তাকিয়ে রইলো কেমন কেমন করে জানি।

তাঞ্জির তেমন একটা পাত্তা দিল না। এভাবে বেশ কিছু মূহুর্ত চলে গেল। ওর গুন গুন ও থামেনি। হঠাত শুনতে পেল পিচ্চি কথা বলে উঠেছেঃ
"আপনাকে আমি ঠিক করবো, বুঝছেন? নেশা করে করে জীবন টা কে ধ্বংশ কেন করছেন?"
কি হল বোঝার আগেই নিচ তলায় চলে এল লিফট, দরজা খোলার সাথে সাথেই সেই বোরখাওয়ালী শজারুর মত ছুটে বের হয়ে গেল গেট দিয়ে। কেন জানি তাঞ্জির এর মনে হল বোরখার নিচে হলুদের আভাস।

ভাবলো দৌড় দেয় পিছে, কিন্তু গেট এর দারোয়ান এর কড়া চাহনী দেখে আর সে পথে পা মাড়ালো না ও।
সেদিন ছিল পহেলা ফাগুন। তাঞ্জির একটি হলুদ পাঞ্জাবী পড়ে কলেজে গিয়েছিল সেদিন। সারাদিন মনে পড়ছিল সেই চোখ দু'টির কথা।

রাত ১১ টা পেরিয়ে গেল ঘড়ির কাটা। চার পাশে খালি সবুজ আর সবুজ; খুবই নয়নাভিরাম পরিবেশ। ল্যাম্প পোস্ট এর আলোটা দেখে মনে হচ্ছে যেন সূর্য মামা তার জৌলুস এর কিছুটা ধার দিয়েছে তাকে। আসে পাশে তেমন কেউ নেই, পার্ক এর এই অংশটা শুনশান, নিরব, নিস্তব্ধ। এমন কি নিশিকণ্যা ও তাদের দালালেরাও সহজে এদিকে আসতে চায় না। ওরা তিনজন এই জায়গার পারমানেন্ট বাসিন্দা। প্রায় প্রতিদিন সন্ধ্যায় ওরা তিন জন চলে আসে মাল মশলা সমেত। পুলিশ ও মাস্তান কেউ ওদেরকে ঘাটায় না, কারণ ওদের মাঝে আছে একজন প্রভাবশালী নেতার কনিষ্ঠ সন্তান। বাকি দুইজন ও সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। ইউনিভার্সিটি তে গিয়ে ওদের বন্ধুত্ত। অল্প দিনেই গাজা থেকে শুরু করে সকল মাদক দ্রব্যে আসক্ত ও অভ্যস্ত হয়ে পড়ে তিন জনেই। কেটে যায় সপ্তাহ, মাস, বছর--শেষ হয় না কোর্সগুলো।

"দোস্ত, শুন্সি টিকটিকির লেজে নাকি সবচেয়ে ভাল নেশা হয়। একটু জাম্বাক মিশায় তারপর লেজটা একদম ডাইরেক্ট মুখে দিয়ে দিতে হয়"।
"ধুর ...ল , এগুলা কি বলিস ...দনার মত? ওই দেখ কি সুন্দর সূর্য্য উঠসে"
"হ্যাঁ, আর ওই দেখ, তোর বোরখাওয়ালী আইতেসে এদিক দিয়ে"

বুকের মধ্যে টন টন করে উঠলো তাঞ্জির এর। মনে হল যেন এই মাত্র মুহাম্মদ আলীর মোক্ষম একটি ঘুষি এসে লাগলো তার পাঁজরে। না, পারেনি সে। পিচ্চি মেয়েটা পারেনি তাকে ঠিক করতে। বরং যতটুকু ঠিক ছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ভেঙ্গে গিয়েছে সে। নেশা করতে করতে আর সিগারেট টানতে টানতে দম আর নেই, গান গাইতে গেলে আসে কাশি, ভুলে যায় এক লাইনের পর দুই লাইন।

তারপরেও যখন মাঝে মাঝে এক দুই দিন গলা ছেড়ে গাইতে থাকে "আমি তারায় তারায় রটিয়ে দেব, তুমি আমার", নিশিকণ্যারা খদ্দের খোজা বাদ দিয়ে কান পেতে শুনে সেই গান, প্রকৃতি যেন থমকে যায় কিছুক্ষণের জন্য। ফিরে আসে সেই আলোকিত বারান্দা আর হলুদ আভা, গিটারের টূং টাং। কিন্তু সে ভাল অনুভূতি ক্ষণিকের; আসে না কোন বোরখাওয়ালী, ঠিক হয় না কোন কিছুই। আবার আকড়ে ধরে সে নেশাদ্রব্য কে।

বেহুশ হয়ে পড়ে থাকে সে, আর ১২, ৪৩৪ কিলোমিটার দূরে অন্য আরেকজন কে ঠিক করতে থাকে বোরখাওয়ালী; বাড়ীর সামনে পূরু হয়ে জমে থাকা বরফ পরিষ্কার করে বেলচা দিয়ে।

শেষ দেখা হয়েছিল বছর দুই আগে। বোরখাওয়ালীর বোবা অভিমান তাঞ্জির এর নেশাগ্রস্থ মস্তিষ্কে কোন ভাবের উদয় ঘটাতে পারে নি।

ঘড়ির কাটা ১২ টা পেরুল, আরেকটা ফাগুন মাস এল।

জ্ঞান হারানোর আগে তাঞ্জির এর শেষ কথাটি ছিল "ফাগুন এর খেতা পুড়ি"।

দাদুকে মনে পড়ে

আজকে আমার দাদু সুরাইয়া খানম এর ১৮ তম মৃত্যু বার্ষিকী।

আমার দাদা শহীদ বুদ্ধিজীবী ডঃ সিরাজুল হক খান রাজাকার বাহিনীর হাতে অপহৃত হন ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর। উনার লাশ পাওয়া যায় রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে।

দীর্ঘ ২৯ বছর দাদু প্রায় একক ভাবে ৫ ছেলে ও ৩ মেয়ের বড় সংসার কে টেনে নিয়েছেন। দাদা যখন মারা যান, তখন আমার আব্বা ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র এবং বড় চাচা সদ্যবিবাহিত এবং মাত্র চাকরী শুরু করেছেন। বাকি চাচা ফুফুরা অনেক ছোট ছিলেন। পরবর্তীকালে ছেলে মেয়েরা বিভিন্ন ভাবে দাদুকে সহায়তা করলেও উনিই ছিলেন নেপথ্যের চালিকাশক্তি। ছোট বড় সংকটে দাদুর কথাই ছিল শেষ কথা।

আমাদের অনেক সৌভাগ্য যে দাদুর আদর পেয়ে বড় হতে পেরেছি। উনি মারা যাওয়ার পরেই কেবল বুঝতে পেরেছি পরিবারে মুরুব্বির ভূমিকা কত বড়। ১৮ বছর চলে গিয়েছে, কিন্তু এখনো মনে পড়ে উনার সাথে প্রতিটি কথোপকথন।

দাদুর গল্প লিখে শেষ করতে পারবো না। যেই উনাকে দেখেছেন, চিনেছেন, তিনিই উনাকে মনে রেখেছেন আজ অবধি। শধু একটা গল্প শুনাই।

আমাদের বাসায় অনেক ফেরিওয়ালার আনাগোনা ছিল। দারোয়ান সব সময় রাখতাম না আমরা, কারণ বিল্ডিং এর নিচ তলায় ব্যাংক ছিল এবং ব্যাংক এর গার্ড থাকতো ২৪/৭। মূলত দারোয়ান না থাকার কারণেই ফেরিওয়ালারা সোজা উঠে যেতে পারতো তিন তলায়, বাধাহীন ভাবে।

কেউ হয়তো নিয়ে আসতো ইলিশ, কেউ সব্জী, আবার কেউ আনতো মুরগী--সবার সাথেই দাদু দরদাম করতেন। এমন সব দাম বলতেন যে শুনে ওদের আক্কেল গুড়ুম হয়ে যেত। এক মাছওয়ালা একদিন দাদুর বলা দাম শুনে কানে হাত দিয়ে পাতিল মাথায় নিয়ে দৌড় দেয়। আমার নিজের চোখে দেখা সে ঘটনা। সম্ভবত ২০০ টাকা দাম চাওয়া মাছের দাম ২০ টাকার বেশি হবে না ধরণের কিছু একটা বলেছিলেন দাদু।

যাওয়ার সময় বলছিল " কানে ধরেছি, আর আসবো না জীবনে"। কিন্তু ঠিকই তারা ফিরে আসতো আবার। কারো দাদী, কারো নানী হয়ে উনি কখনো বেশি দাম দিয়ে আবার কখনো অনেক কম দামেই কিনতেন নানা পণ্য। বেশিরভাগ সময় জিতে যেত ফেরিওয়ালারাই, সবাই ফিরে যেত হাসি মুখে।

বাসায় বাজার থাকলেও কিনতেন; উনার জন্য এই কাজটি কিছুটা শখ এর মত ছিল, এবং আর কেউ না বুঝলেও আমি বুঝতাম যে এটা ছিল উনার এক ধরণের বদান্যতা।

আমাদের তিন তলায় তিনটি ফ্ল্যাটে আমরাই থাকতাম, তাই কমন একটা গেট ছিল। মাঝখানের করিডোরে একটা বড় চেয়ার রাখা থাকতো দাদুর জন্য। সেই চেয়ারের সামনের মেঝেতে ফেরিওয়ালারা বসতো তাদের বেসাতি নিয়ে।

প্রতিদিনই কোন না কোন ফেরিওয়ালা আসতো; এসেই হাঁকডাক -- "কই দাদী কই? সবচেয়ে ভাল মাছ নিয়ে আসছি আপনার জন্য, একবার খাইলে জীবনে ভুলবেন না"।

তখন আমার আম্মা, কিংবা চাচী খুব কষ্ট নিয়ে দুঃসংবাদ টা দিত। "আম্মা আর নাই"।

একেকজনের প্রতিক্রিয়া হত একেকরকম। কেউ শকড হোত, কে বা কান্না শুরু করতো, কেউ অবিশ্বাসে মাথা দুলাতে থাকতো। একজন কোন কথা না বলে দৌড়ে চলে গিয়েছিল নিচে। একজন বিশ্বাস ই করতে পারে নাই, বলে যাচ্ছিল "কি কন? কি কন? উনি বাড়ি গেসে? কবে ফিরবে?"।

দাদু নিজেও জানতেন না কত মানুষ কে উনি প্রভাবিত করেছেন। দাদু মারা যাওয়ার পর প্রায় বছরখানেক একই দৃশ্যের অবতারণা হত। কেউ না কেউ এসে দুঃসংবাদ শুনে দুঃখ করতে করতে চলে যেত।


মোটামুটি সুস্থ্য অবস্থাতেই উনি মারা যান। হাসপাতালে গিয়েছিলেন সহজ উপসর্গ নিয়ে; হঠাত করেই অবস্থার অবনতি এবং মৃত্যু। উনি যে হাসপাতালে, সেই খবরটাই তখনো সবাই জানতো না।


দাদা কে কোনদিন দেখি নাই, কিন্তু দাদুর মাঝে দেখেছি একজন বিশুদ্ধ, আত্নত্যাগি ও আদর্শ মানুষ। আল্লাহ উনাকে বেহেস্তবাসী করুন।

সবাই দয়া করে উনার বিদেহী আত্মার জন্য দোয়া করবেন আজকে।

Friday, March 02, 2018

কফির কাপে পরিচয়

কফির কাপে পরিচয়

ওদের রান্নাঘরে ডাবল বার্নারের ইতালীয় চুলা। শখ করে গুলশান এর ডিসিসি মার্কেট থেকে কেনা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল মূলত স্বয়ংক্রিয় , ম্যাচের কাঠি বিহীন আগুন ধরানোর আয়েশী পন্থা উপভোগ করা। কিন্তু, বিধিবাম! কিনে আনার অল্প কিছুদিনের মধ্যেই অতিরিক্ত টেপাটিপি ও অযত্নের শিকার হয়ে সেই সুন্দর সিস্টেমটি বিগড়ে গেল। শখ করে চুলা কেনা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ত্রুটি সারানোর জন্য আর তাকে গুলশান পর্যন্ত বহন করে আর নিয়ে যাওয়া হল না। কিছুদিন পর একটি বার্নার বিকল হয়ে চুলা "সিংগেল" হয়ে গেল।

বেসিনের পাশে, বেশ উচায় কাপ রাখার হোল্ডার টা ড্রিল করে লাগানো হয়েছিল। নিতান্তই লম্বা না হলে বেশ কসরত করে পেড়ে আনতে হয় একটি কাপ কিংবা মগ। মেপে মেপে দেড় কাপ পানি ঢেলে দিতে হয় চা কফি বানানোর সসপ্যানটিতে। ফস করে দেয়াশলাই জ্বালিয়ে চুলা ধরাতে হয় ।

মৃদু আঁচে পানি গরম হতে থাকে।

কাপবোর্ডে নেসকাফে গোল্ড কফির একটি টিন। সাধারণ নেসক্যাফে কিংবা ভেন্ডিং মেশিন এর কফির চেয়ে এই বিনস গুলো খেতে ভাল; তবে এমন কোন আহামরি স্বাদের কিছু না। কিনে নিয়ে আসে ঠিকই, কিন্তু কেউ খুব বেশী খুশী হয়ে পান করে না এই কফি। সারাক্ষণ নর্থ এন্ড আর গ্লোরিয়ার সাথে তুলনা চলতেই থাকে!

প্লাস্টিক এর কৌটায় ৪০০ গ্রাম গুড়া দুধের একটি প্যাকেট। খোলা প্যাকেট এর মুখ প্লাস্টিক এর বাইন্ডার দিয়ে আটকে রাখা। খুব দামী কোন ব্র্যান্ড নয় এর গুড়া দুধ নয়; চা পানের জন্য ফ্রেশ কিংবা মার্কস কেনা হত।

প্রিয় মূহুর্ত! চায়ের চামচে করে চার চামচ দুধ নিতে হয় মগে।তার ওপর ভরা এক চা চামচ কফি। সাথে এক প্যাকেট জিরো ক্যাল। ফ্রিজে থাকা ৮০% ডার্ক চকলেট এর বারটি থেকে এক কোনা ভেঙ্গে ছোট ছোট টুকরো করে কাপে ঢেলে দিতে হয়। তারপর ফুটন্ত সসপ্যান থেকে অল্প একটু গরম পানি ঢেলে দেয়া, এবং চায়ের চামচ দিয়ে প্রবল বেগে নেড়ে নেড়ে একটি থকথকে মিশ্রন তৈরি করা।

বাকি পানিটা একটু পরেই ঢেলে আরেকটু নেড়ে নিতে না নিতেই পুরো ঘর ভরে যায় গলন্ত চকোলেট ও কফির সম্মিলিত ফ্লেভারে তৈরি সুঘ্রানে। নিজের শিল্পকর্মে সম্পূর্ণ সন্তুষ্ট হয়ে কাপে চুমুক দেয় টম। দেখতে না দেখতে আধ কাপ খালি করে ফেলে ও। অতিরিক্ত উতসাহে জিহ্ববা পুড়িয়ে ফেলে ও। এ কি বিপদ হল!

হঠাত বিষন্ন হয়ে যায় টম। পাশের রুম থেকে দু''টি শিশু বিড়াল এর মিউ মিউ ধ্বনি শোনা যাচ্ছে। টম এর মনে বিষন্নতার পাশাপাশি ভয়, আশংকা, এবং কিছু পরিমাণে অনুতাপ ভর করে।

আজকে সকালে ঘুম থেকে উঠার পর থেকেই দেখছে রিতা আর রাসেল ওর মত চেহারা বানিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে। ওরা এতই ছোট হয়ে গিয়েছে যে বিছানা থেকে নামতেও পারছে না।

আর ওর বহুদিনের স্বপ্ন সত্যি হয়েছে--দুই হাত ও লম্বা পা নিয়ে ও এখন সব করতে পারছে। কফি শেষ করে কাপ হাতে নিয়ে আয়নায় চোখ পড়লো ওর।

পাশের বাসার মহসীন সাহেব এর বয়স সত্তর এর উপর; কানে কম শুনেন। যা শুনেন, তাও ঠিক মত ঠাহর করতে পারেন না। তাও উনার মনে হল যেন একটি অমানুষিক চিৎকার শুনতে পেলেন তিনি, পাশের বাসা থেকে। বেশিক্ষণ চিন্তা করতে হল না। ভুলে গেলেন কি নিয়ে ভাবছিলেন। চিৎকার রুপান্তরিত হল ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক এ।

(শেষ)


Tuesday, February 06, 2018

জানালার পাশে পর্ব ৩

মিরিন এর মনের মাঝে চলছে ঝড় ঝঞ্ঝা। উত্তাল সাগরের ঢেউ এর মত একেক পর এক চিন্তা আছড়ে পড়ছে মনের মাঝে।বু কে সিরিয়াস বকা দিয়েছে ও। প্রতিদিনের মত কাজ থেকে ফিরে ঘরে ঢোকার সাথে সাথে ওর কোলে ঝাপিয়ে পড়েছিল আদুরে ডাক দিতে দিতে, কিন্তু জীবনেও যা করিনে মিরিন আজ তা করে ফেলেছে নির্দ্বিধায়--ঝটকা দিয়ে বু কে ফেলে দিয়েছে কোল থেকে। আহত ও ব্যাথিত মানব সন্তানের মত মায়াকাড়া দৃষ্টিতে বু তাকিয়ে ছিল মিরিন এর দিকে। দুঃখ ও অভিমানের মিশ্রণে বোবা কান্না কেঁদেছিল বেশ কিছুক্ষণ।

(ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে মৃদু সুরে কান্ট্রি সং)
("Me and you and a dog named boo
Travellin' and livin' off the land")


প্রবাস জীবনের প্রায় শুরু থেকেই বু তার বেস্ট ফ্রেন্ড। ক্লাশ শেষে একদিন হেটে বাসায় ফেরার সময় একটা পেট শপ এর সামনে থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল মিরিন। অতিকায় কৃশকায় ছেলেটাকে সে শুধুই মনে রেখেছে "পেট শপ বয়" হিসেবে। এর আগে কখনোই সে দেখেনি এত লম্বা কোন মানুষ। বেহায়ার মত চেয়ে ছিল ছেলেটির দিকে, কোন রকম ভালবাসা কিংবা ভাল লাগার অনুভব নিয়ে নয়, বড়ং বোবা কৌতুহল থেকে।

"Yo girl, whassup? What'cha lookin at?" শুনে সম্বিত ফিরেছিল ওর।

ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে পেট শপ বয়েজ এর গান

(Every time I see you something happens to me
Like a chain reaction between you and me
My heart starts missing a beat
My heart starts missing a beat
Every time
Oh oh oh, every time)
https://youtu.be/wTkfK2g4pKI

মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গিয়েছিল সেই পোষা প্রাণীর দোকানে, আর প্রায় এক ঘন্টা লাগিয়ে কিনেছিল জ্যাক টেরিয়ার রাসেল কুকুরটি। জারমেইন ওকে জানিয়েছিল যে এই কুকুরটি আগে আরেক বাসায় ছিল, ওরা ওকে "বু" ডাকতো। ও আর নাম টা বদলায়নি। জারমেইন এর সাথেও আর কখনো দেখা হয় নি ওর।কিভাবে বু আরেক বাসা থেকে ওর দোকানে এল, সেটাও আর জানতে চায়নি মিরিন।

এসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে হাত থেকে ছুড়ে মারলো সে ব্রাউন খামটি। ভেতরে ভারী কিছু না থাকায় ঘুরতে ঘুরেতে বুমেরাং এর মত সেটি গিয়ে গোত্তা খেল বই এর আলমারীর কাঁচের সাথে। খামের একটি কোনা আটকে গেল কাঠের ফ্রেম এর সাথে। এয়ার কুলার এর বাতাসের ধাক্কায় চিঠিটা কাঁপতে থাকলো ক্রমাগত।

মনের বিষন্নতা কে দূর করার জন্য টিভি ছাড়লো ও। তখনো শোনা যাচ্ছে অবোধ প্রাণীটির ক্ষীন আওয়াজ। টিভি ছাড়ার সাথে সাথেই শুরু হল আবহাওয়ার বার্তা।

"Welcome to tomorrow's weather forecast. Tomorrow will be a sunny day and the sky will be in its bluest form. It will be a perfect day to visit the blue sea and to gaze at the blue sky all day long".

"ধেত্তেরি, সব খানে খালি নীল আর নীল!" বলে টিভি বন্ধ করে রিমোট টা মোটামুটি ছুড়েই ফেল্ল মিরিন।

মিরিন এর প্রায় সব ক্লাশমেট ডর্মে কিংবা রুমমেট নিয়ে থাকে। ছোটবেলা থেকেই ও এক্টূ ইন্ট্রোভার্ট টাইপ; ডর্মে থাকার কথা ও কল্পনাও করতে পারে না! বিশেষ করে এক সিনেমায় ডর্ম এর শেয়ার্ড ওয়াশরুমের ভয়াবহ নমুনা দেখার পর থেকে ওর ডর্ম ভীতি অন্য লেভেলে চলে গিয়েছে।

রুমমেট এর ব্যাপারে ও অনেক ভেবেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও দ্বিধা, দ্বন্দ্ব ও ভয় ওকে বাধা দিয়েছে এতকাল । হঠাত ওর গালে লাল আভা ফুটে উঠলো। ভেবেছিল এবার ফিরলে নীল কে বলবে ওর রুম মেট হতে। ওর ব্যাপারে বিন্ধুমাত্র দ্বিধাও ছিল না ওর মনে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার চোখ টা গেল আধ-ঝুলন্ত খামটির দিকে। খামটির মতই ওর আর নীল এর সম্পর্ক এখন দূর্বল ভিত্তির উপর।

আজকাল আর কেউ পেপারওয়েট কেউ ব্যাবহার করে না, কিন্তু তারপরেও কেন জানি একটা ছিল মিরিন এর বাসায়। প্রবল ক্রোধের সাথে হাতের মুঠোয় নিয়ে নিল সে পেপার ওয়েট টি। ফুঁসতে লাগলো রাগে...

(চলবে)





Monday, January 15, 2018

জানালার পাশে পর্ব ২

জানালার পাশেঃ পর্ব ২


পূর্ণিমার চাঁদের মাঝে একটি বিশেষ ধরণের মাদকতা রয়েছে। মাঝরাতে যখন গোল হয়ে চাঁদখানা মাথার উপর উঠে থাকে, তখন অন্য কোন কিছুর দিকে তাকাতে ইচ্ছে করে না। চাঁদের আলোর প্রতিবিম্ব সমুদ্রের পানির উপর আড়াআড়ি ভাবে পড়ে, সেটাকে দূর থেকে একটি লম্বা অট্টালিকার মত দেখা যায়। পানির কম্পনের সাথে সাথে সেই অপরুপ আলোও কাঁপতে থাকে, এবং মনে হয় যেন সরু হতে থাকা সেই প্রতিবিম্ব ধরে সাঁতরে চলে যাওয়া যাবে চাঁদে।

পূর্ণিমা মানেই মিরিন থাকবে চন্দ্রাহত। পাশে বসে থাকবে ঘন্টার পর ঘন্টা, কিন্তু চোখ থাকবে আকাশের দিকে। নীল প্রথম প্রথম অবাক হত, কিন্তু পরে ব্যাপারটার সাথে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল।

থেমে থাকা গাড়ী তে বসে মিরিন এর দিকে অপলক দৃষ্টিতে আরো কিছুক্ষন চেয়ে থাকলো নীল। আবার ফিরে গেল সে অতীতে।

ম্যাক এ লাঞ্চ করার পর বেশ কিছুদিন চলে গিয়েছে। সেদিনের পাগলামি আচরণ এর কথা মনে পড়লে নীল এর ফর্সা মুখে লাল বেগুনী রঙ ফুটে উঠে। সেদিন ভার্সিটি ডর্মে আড্ডা মারতে মারতে হঠাত আনমনা হয়ে সেদিনের কথা ভাবছিল নীল। স্প্যানিশ বান্ধবী মারিয়া ওর মুখের সামনে জোরে তুড়ি বাজানোর পর তার সম্বিত ফিরলো। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে, কি হচ্ছে বোঝার আগেই মারিয়া উধাও, দূর থেকে ক্যাটওয়াক দেখা আড় "idiota!" ডাক শোনা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না তার।

আবার ডুবে গেল সে দিবাস্বপ্নে। নিরীহ মেয়েটি অনেক লজ্জা পেয়েছিল সেদিন! ওর হাতে মোটামুটি জোর করেই তার নাম্বার টা ধরিয়ে দিয়েছিল নীল, কিন্ত মেয়েটি মাথা তার দিকে একবারো তাকায়নি।

কাগজ টা নিয়েছিল সে। ছিঁড়ে ফেলে দেয়নি, মুঠোবন্ধ করে রেখেছে।তার নামটিও জানা হয় নি সেদিন । নীল যখন গট গট করে বেরিয়ে যাচ্ছিল রেস্তোরা থেকে, সে একবারো ফিরে তাকায়নি। তাকালে দেখতে পেত তার পিঠের ওপর স্থির হয়ে আছে এক জোড়া মায়াবী, প্রায় আদ্র চোখ।

ডর্ম থেকে বেরিয়ে ক্লাশে গেল নীল। ক্লাশেও খুব একটা মনোযোগ দিতে পারলো না সেদিন। ক্লাশ শেষে খেয়াল করলো দূর থেকে মারিয়া ওকে দেখছে। হয়তো ভাবছে সে এগিয়ে গিয়ে সরি বলবে। তবে নীল এর মন সেদিন অন্যদিকে ছিল। বিস্মিত হয়ে ক্লাস এর সেরা সুন্দরী খেয়াল করলো তাকে সম্পূর্ণ অবজ্ঞা করে গটগট করে বেরিয়ে গেল পূর্বদেশীয় হ্যান্ডসাম ছেলেটি। অস্ফুটে আবার বলে উঠলো সে "ইডিওটা!"।

ভার্সিটি সংলগ্ন পার্কে চলে গেল নীল। ও নিজেও জানে না কিভাবে কিভাবে সে পাথরের তৈরি বেঞ্চ এর সামনে চলে এল। ক্লাশ রুম থেকে এখানে আসা পর্যন্ত পথটির কোন স্মৃতি তার নেই। খালি মনে পড়ছে মেয়েটির লাল হলুদ ইউনিফর্মের সাথে সম্পূর্ণ বেমানান নীল রঙ এর কানের দুল এর কথা।

পার্কের নিস্তব্ধতা কে ভেঙ্গে দিয়ে একটি অচেনা নাম্বার থেকে কল এল, বেজে উঠলো লাস্ট রিসোর্ট গানের প্রথম পংক্তি দ্বয়ঃ

"Cut my life into pieces

This is my last resort"


অচেনা কন্ঠ, কিন্তু শুনেই নীল বুঝলো সেই রেস্টুরেন্ট ললনা ফোন করেছে। ১০ মিনিট এর সংক্ষিপ্ত আলাপ। সেখান থেকে কফি শপে দেখা। প্রতি সপ্তাহের রুটিন প্রতিদিনের রুটিনে যেতে বেশিদিন লাগেনি। একই শহরে থাকতো দু'জনে, তবে বিপরীত প্রান্তে।

দুইজনের মধ্যে তেমন কোন মিল ছিল না। নীল ছিল অনেক সরব, মিরিন ছিল লাজুক। নীল থাকতো আসরের মধ্যমণি হয়ে, আর মিরিন এর একমাত্র সঙ্গী ছিল তার পোষা জ্যাক রাসেল টেরিয়ার কুকুরটি। আদর করে তাকে সে ডাকতো "বু" বলে।নীল ছিল অবস্থাপন্ন পরিবারের কনিষ্ঠ সন্তান, আর মিরিন ছিল নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারের আশা ভরসার প্রতীক।

মিরিন বেশি কিছু বলতো না, মুখ টিপে হাসতো খালি, আর শুনতো নীল এর শিশুদের মত হাত নেড়ে নেড়ে বলা মিষ্টী কথা গুলি। নীল প্রায়ই অভিযোগ করতো "তুমি এত কম কথা বল কেন?"। মিরিন বলেছিল "আমি লিখতে পারি, বলতে পারি না"।

দেখা হওয়ার ঠিক এক মাসের মাথায় দেশ থেকে এল জরুরী তলব, সাত দিনের নোটিশে নীল ফিরে গেলে দেশে--অসুস্থ্য মা কে দেখতে। পৌছে গিয়ে পেল বড় বড় কিছু সারপ্রাইজ। দ্বিতয় দিনে নীল এর মেইল বক্সে এল হাতে লিখা নীল খামের চিঠি। কাগজ টি সাদা, হাল্কা ল্য্যাভেন্ডার পারফিউম এর সুগন্ধ মাখা। সেখানে গোটা গোটা হাতে নীল কালিতে লিখা একটি কবিতা, যা নীল এর জীবন কে ওলট পালট করে দেয় নিমিষে।

"উষার আকাশের নব উদিত তারার আভাসে আঁঁচও করিনি,
একদিন.....
হৃদয়মম উচ্ছলিয়া প্রনয় গাঁথা রচিব।
এমন প্রেমোন্মত্তে সিক্ত হবো।

সদাই বিমোহিত হয় অবারিত মন....
আমার ছায়াপথ কেনো
পুরোটাই তোমায় আচ্ছন্ন!
আমার আকাশপটে কেনো
কেবলি তুমিই!

পূর্ণিমাতিথিতে সাগরের জলরাশির উন্মাদনার মতো,
একদিন......
পুরোটাই আমি কেনো তোমায় সঁপে দেবো!

তবে.....
সব প্রাপ্তিযোগে পূর্ণতা আসে না !
শুধু হয় মুগ্ধতার সলিলসমাধি।

তাই......
পূর্ণতা নয়!
মুগ্ধতার রঙধনুতে প্রোজ্জ্বল হোক
আমার সরোবর।

ঠিক তেমনি করে,
একদিন.....
এক আকাশ মুগ্ধতা নিয়ে
মিলিয়ে যাবো অমানিশার কালান্তরে।"

এক নিমিষে পড়ে ফেল্লো নীল। তারপর আবার। কমপক্ষে ২০-৩০ বার পড়লো চিঠিখানা। কিন্তু আবেগ কে নিয়ন্ত্রণ করে রাখলো সে, ভাবলো চিঠির উত্তরে চিঠিই দিতে হবে। হাতে তুলে নিল কাগজ কলম, কিন্তু দুই লাইন এর বেশি আগালো না। তখনো সে বোঝেনি যে মিরিন এর চিঠির চেয়েও বড় সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিল ওর জন্য।

অসুস্থ্য মা পরের দিন তার হাত ধরে একটি অনুরোধ করলেন।

(চলবে)



















Thursday, January 04, 2018

জানালার পাশে পর্ব ১

রাত বাজে ৩ টা।

একটার পর একটা গাড়ী চলে যাচ্ছে ধূলোর ঝড় উড়িয়ে। গাড়ীর জোরালো শব্দ বার বার রাতের সুনশান নীরবতা কে বিঘ্নিত করছে। জানালা টা নামিয়ে দিবে ভাবছে নীল, কিন্তু আবার বাতাস টাও মন্দ লাগছে না।

(ব্যাকগ্রাউন্ডে বাজছে গান। খুব কম ভলিউমে, কান পাতলে শোনা যায় লিরিকসঃ
The cars hiss by my window,
Like the waves down on the beach)

রাত ১ টার পর থেকে একটা অদ্ভত সময় শুরু হয়। বেশিরভাগ মানুষ ১ টা থেকে ৫টা পর্যন্ত সময়টা ঘুমিয়ে উপভোগ করে। নাইট শিফট এর কর্মীদের কথা অবশ্য আলাদা।

নীল এর ৯-৫ চাকরী। সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হয়, কিন্তু তাও রাতে বেশি ঘুমায় না। বহুদিনের অভ্যাস।

(একই লাইন আবার রিপিট হচ্ছেঃ
The cars hiss by my window,
Like the waves down on the beach)

কাছেই রকি বিচ। ঢেউ এর মৃদুমন্দ ঝংকার এর সাথে প্রিয় শিল্পীর সংগীত। Blues ধাচের গান।

স্টিয়ারিং হুইল ধরে আছে মিরিন। অনেক্ষন ধরে গাড়ীর ইঞ্জিন নিস্তব্ধ। গাড়ীর সব বাতি নেভানো, শুধু স্টেরিও তে চলছে গান। নীল তাকিয়ে আছে মিরিন এর দিকে। মেয়েটা একদম হাতের নাগালের মদ্ধ্যে, কিন্ত তবু কেন জানি বহুদুরে।

(গানের পরের লাইন বাজছেঃ
I got this girl beside me
But she's out of reach )

নীল এর মনে পড়ে যায় উদ্দাম ইউনিভার্সিটি জীবনের কথা। ওর জন্ম ও বেড়ে ওঠা এ দেশেই। ছোটবেলা থেকেই গ্রেকো রোমান কুস্তিগীড় এর প্যাঁচের মত করে দৃঢ় আলিংগনে জড়িয়ে ধরেছিল সে পশ্চিমা জীবন কে। তাকে দেখলেও সহজে মানুষ বুঝতো না যে তার পূর্বপুরুষ রা এসেছিল দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গরিব দেশটি থেকে। সে জীবনেও দেখেনি পা দিয়ে কাউকে বেশিক্ষণের জন্য ফুটবল খেলতে।

মায়ের ভাষা সে ভুলেই যেত, যদি না প্রতিদিন দেশ থেকে ফোন রিসিভ করতে হত। মা একবার কল করলে আর ছাড়তেই চেত না।

এরকমই একদিন ম্যাকডোনাল্ডস এ বসে মায়ের সাথে কথা বলছিল নীল। তাকে খাবার দিচ্ছিল একটি পূর্বদেশীয় ছিপছিপে তরুণী। ফোনে মশগুল থাকায় ভাল করে খেয়াল ও করেনি কি বলছিল তাকে মেয়েটি। সে মায়ের দীর্ঘ আলাপ থেকে মুক্তির পথ খুজছিল। মা ঘুরে ফিরে খালি একটা কথাই বলছিল।

"কোর্স শেষ করে দেশে আয়, বিয়ে কর। আমরা নাতি নাতনীর চেহারা দেখি"। কিন্ত প্রত্যুত্তরে হ্যাঁ হু ছাড়া কিছুই বলতো না নীল। আদতে তার দেশে ফেরার কোন ইচ্ছে ছিল না। অন্তত সেদিনের আগ পর্যন্ত।

হঠাত সে শুনলো একটা তরুণী তার কানের কাছে এসে বলছে "ভাইয়া, বার্গার এর সাথে ফ্রেঞ্চ ফ্রাইস আর কোক নিবেন?"

থতমত খেয়ে ফোন থেকে মাথা তুল্লো নীল। প্রথম বারের মত ভাল করে খেয়াল করলো সে তার সার্ভার কে।

বেশ কিছুক্ষণ পরে সম্বিত ফিরে পেল নীল। ততক্ষনে হতোদ্যম হয়ে চলে গিয়েছে তরুণী। যে কাজ জীবনেও করে নি, সেদিন সেটাই করেছিল নীল। পকেট থেকে এক টুকরা আকাশী রঙ এর কাগজ বের করে তাতে লিখে দিয়েছিল নিজের ফোন নাম্বার। দৌড়ে গিয়ে সেই সার্ভার এর হাতে কাগজটি গুঁজে দিয়ে দেখেছিল তার লাল নীল হওয়া মুখ। কল মি মেইবি? বলে ফিরে গিয়েছিল বার্গার এর কাছে।

বর্তমানে ফিরে এল নীল।

মিরিন এর হাত স্টিয়ারিং এ, কিন্তু গাড়ী চলছে না। ঘুমাচ্ছে ও।

"ঘুমাক। বহুদিন বিশ্রাম পায়নি ও। চায় ও নি। তবে তাতে কিছু আসে যায় না"। 

(ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে যাচ্ছে গিটার এর করুণ সুর)








Wednesday, December 20, 2017

দাদার গল্প ২

বাবা তখন বিভোর ছেলের মায়ায়। বন্ধুর ডাক শুনেও না শোনার ভান করলেন। বন্ধু বুঝলেন তিনি অতীব দূর্লভ একটি আবেগঘন মূহুর্তে উপস্থিত হয়েছেন। কিছুক্ষন তাকিয়ে থেকে ভাবীর কাছ থেকে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন নিজ পথে।

সেরাতে কনিষ্ঠ সন্তান রইল সবার চোখের মণি হয়ে। অন্য ভাইয়েরা কিঞ্চিত ঈর্ষান্বিত হলেও কিছু বল্লো না "ছোট ভাই" বিধায়। সে রাতে আর সবাই একসাথে বসে খাওয়া হল না, যে যার মত খেয়ে নিল ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে। 

সন্তানেরা একে একে ঘুমিয়ে পড়লো যে যার মত। 

বাবার চোখে ঘুম নেই। গিন্নী অন্য যেকোন দিনের মতই পানের বাটা থেকে পান সুপারী বের করে হামানদিস্তায় ছেঁচতে বসলেন। এ কথা সে কথা বলতে লাগলেন পান সুপারী পিষে ফেলার মাঝে মাঝে।

"ওগো, শুনেছ নাকি? পাশের বাড়ীর জলিল সাহেব এর মেয়েদের জন্য গানের শিক্ষক রেখেছে। আমাদের মেয়েগুলির  জন্য দেখবে নাকি? প্রয়োজনে ওরাও ঐ বাসায় গিয়ে এক সাথেই শিখবে। আমার খুব সখ আমার মেঝ মেয়েটা চুলের বেণী দুলিয়ে দুলিয়ে গান গাইবে স্কুলের অনুষ্ঠানে। মাইনে টাও খুব বেশি নয়"। 

বড় মেয়ে একটু গম্ভীর প্রকৃতির, এ বয়সেই অংকে খুব ভাল। মা যেকোন ছোট খাট হিসেব নিকেশ এর কাজ ওকেই দেন করতে, এবং খুব দ্রুত সে তা করেও দেয়। ভাই দের দুষ্টামি ও দুরন্তপণা কে ভ্রকুটি দিয়ে নিরুৎসাহিত করে বলে ভাইদের সাথে দুরত্ত্ব বেশি।  

এদিকে আবার মেঝ মেয়েটা খুব হাসি খুশি, চঞ্চল ধরণের। ভাইদের জন্য অনেক মায়া । একদিন দুপুরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে একা একা গাইছিল অচেনা কোন এক সুরে, মা মন্ত্রমুগ্ধের মত শুনলেন অনেক্ষন। তখনি সিদ্ধান্ত নেন মেয়েকে গান শিখাবেন। 

মায়ের চিন্তাসূত্র এক সময় ছিন্ন হল। লক্ষ্য করলেন যে স্বামী একটা শব্দও করেন নি। এ ধরণের প্রাত্যহিক ব্যাপার গুলো নিয়ে জামাই বউ প্রায়শই আলাপ করে থাকেন। সাধারণত গিন্নী বলতে থাকেন, আর উনি হু হা করতে থাকেন। সাংসারিক ব্যাপার গুলোতে স্ত্রীর বিচার বুদ্ধির উপর উনার অনেক আস্থা।

তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ও আছে।  যতবার মেয়েদের গান শেখানোর প্রসংগ এসেছে, উনি শক্ত ভাবে প্রতিবাদ করেছেন। মেঝ ছেলের বিদ্যাপিঠ এর অংকন শিক্ষক অমল বাবুর সাথে একদিন কথা হচ্ছিল।

"স্যার, আপনার ছেলে তো আমার ক্লাশ এর সবচেয়ে ভাল আঁকিয়ে। এ বয়সে ওর যে আঁকার হাত, বড় হলে নির্ঘাত বিখ্যাত শিল্পী হবে। ওকে অবশ্যই চারু কলায় ভর্তি করাবেন কলেজ এর পর"।

"না হে, আমার ছেলে কে আমি পেইন্টার বানাব না কোন ভাবেই। শেষে দেখা যাবে কোন কাজ না পেয়ে দোকানের সাইন বোর্ড রঙ করছে বসে বসে। সে উপার্জনে ভাত জুটবে কি?"

চৌকস শিক্ষক অমল বাবু যথেষ্ঠ পরিমাণে বিরক্ত হলেও মুখের উপর সিরাজ সাহেব কে কিছু বললেন না। উনি এলাকার সম্মানিত মানুষ। সবাই উনাকে মানে, আর মনে মনে একটু দমে গেলেও অমল সাহেবও বুঝেন যে আসলেও চারুকলার ছাত্রদের আয় রোজগারের পথ বুয়েট পাশ ইঞ্জিনিয়ার দের মত এত সহজতর নয়। তবে তিনি মনে মনে পণ করলেন যে আজ হোক কাল হোক তিনি মেঝ কে নিজেই বলবেন চারুকলার কথা।

কে জানতে পেরেছিল যে সদাহাস্য অমল বাবু সে সুযোগটিও পাবেন না?

সিরাজ স্যার তখন গভীর চিন্তায় মগ্ন, সম্পূর্ণ অন্যমনষ্ক। স্ত্রী যে উত্তরের অপেক্ষায় তার দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে চেয়ে আছে, তা উনার একদম খেয়ালে নেই। উনি তখন মনে করছেন হারিয়ে যাওয়া এক সময়ের কথা।

পরালেখার পাট চুকিয়ে ঢুকেছিলেন সরকারী চাকুরী তে। শুল্ক বিভাগে। পোস্টিং হল চট্টগ্রাম, যা নিজ ভিটা থেকে বেশ দূরে। অন্তত প্রতি সপ্তাহে যাতায়াত করার মত কাছে নয়।

সেখানে উনার কাজটি কি ছিল ? সারাক্ষণ পরিবার কে  স্মরণ করা আর পণ্য আমদানী রপ্তানীর খেয়াল রাখা। সবাই ঠিক মত শুল্ক দিচ্ছে তো? বিবরণী পত্রের সাথে আনীত মালামাল কি মিলেছে? কম বেশি নেই তো?

যথেষ্ঠ পরিমাণে একঘেয়ে কাজ, কিন্ত সময় ও পরিশ্রম সাপেক্ষ। কাজ শেষ করে সরকারী কোয়ার্টারে ফিরতে ফিরতে রাত হয়ে যায়। অল্প খাবার খেয়ে রেডিও শুনতে শুনতেই শেষ হত বেশির ভাগ দিন।

তখনো সেরকম সামর্থ্য নেই যে পুরো পরিবার কে নিয়ে আসবেন সেখানে। বাচ্চারাও ছোট ছোট। ছোট মেয়ে ও ছোট ছেলে তখনো আসেনি। তারপরেও পরিবারে সদস্য সংখ্যা একেবারে কম নয়।

এক মাস ও হয়নি উনি চাকরী তে ঢুকেছেন। অল্প সময়ের মধ্যেই হাড়ভাঙ্গা খাটুনি ও অপরিসীম সততা দিয়ে সবার মন জয় করে নিয়েছেন সুনাম। দক্ষ ও নিষ্ঠাবান কর্মী হিসেবে সবাই সিরাজ কে পছন্দ করে। 

সেদিন ছিল মংগলবার। অন্য যেকোন কর্মদিবসের মতই, দিনের কোন বিশেষত্ত নেই আদতে। নিজের কক্ষে বসে কাগজে লিখে চলেছেন অবিরাম। টেবিল ফ্যান এর স্পিড একেবারেই কমানো। ঘরের মধ্যে শব্দ বলতে কাগজের উপর ফাউন্টেন পেন এর খস খস শব্দ। প্রিয়তমা স্ত্রী কে চিঠি লিখছেন কাজের ফাঁকে ফাঁকে । মাঝে মাঝে থেমে গিয়ে দোয়াতে চুবিয়ে নিচ্ছেন কলম খানা। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে দেখলেন আরো কিছু মাল পত্র এসেছে। সেদিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাত দেখলেন আর্দালী একজন মধ্যম উচ্চতার মানুষ কে নিয়ে এসেছে ঘরে।

খুব বিগলিত কন্ঠে বলে উঠলেন "স্যার, কেমন আছেন? আজ ভারত থেকে কিছু প্রসাধনী আমদানী করেছি।আপনার মেহেরবানি হলে আমাকে একটু তাড়াতাড়ি ছেড়ে দেন। চৌধুরী সাহেব বলেছেন মাল গুলো নিয়ে আজকেই সদরে চলে যেতে"।

"কোন চৌধুরী?"
"চিনেন নাই? আপনার প্রতিবেশী জালাল চৌধুরী"

বিবরণপত্রে দ্রুত চোখ বুলাতে লাগলেন সিরাজ সাহেব। খটকা লাগলো। উঠে গিয়ে বাক্স গুলোর দিকে এগিয়ে গিয়ে চমকে গেলেন ভীষণ ভাবে। বর্ণনার সাথে দ্রব্যের কোন মিল নেই। যা আমদানী হয়েছে, তার শুল্ক অনেক বেশি হবে। সটান ঘুরে গিয়ে সেই মধ্যম উচ্চতার ব্যক্তির দিকে তাকালেন কড়া চোখে।

সে ক্রোধ ও রোখ মিশ্রিত ভয়ংকর চাহনীর দিকে বেশিক্ষণ কেউ তাকিয়ে থাকতে পারতো না। চোখ নামিয়ে নিত নিজের অজান্তেই। অনেক বেশি রেগে গেলেই কেবল উনার এই চেহারা প্রকাশ পেত। ফর্সা মুখ মূহুর্তে লাল টকটকে হয়ে যেত। 

স্কুল শিক্ষক হিসেবে অনেক দুষ্ট শিশুকে শিষ্টতার শিক্ষা দিয়েছেন তিনি শুধু এই দৃষ্টি দিয়েই। 

কিন্তু তিনি অবাক হয়ে দেখলেন সেই খর্বকায় ব্যক্তিটি ভয় পাওয়ার বদলে হাসিমুখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। হাতে একটি খাম।

"কি এখানে?"
"স্যার, আপনার জন্য চৌধুরী সাহেব দিয়েছেন"
"তোর নাম কি রে?"
"জ্বী কি বললেন?"

হঠাত আপনি থেকে তুই তে পদাবনতি পেয়ে লোকটি বেশ অবাক হয়ে গেল। তারপরেও নিচু স্বরে  উত্তর দিল "আমার নাম করিম, স্যার"

"করিম এর বাচ্চা করিম, কোন সাহসে আমাকে ঘুষ সাধিস? আজকে তোর একদিন কি আমার একদিন"

এর পরের কয়েকটি মিনিট কেটে গেল চোখের পলকে। চটাশ করে  করিমের গালে পড়ল বজ্রাঘাত। পায়ের পাদুকাটি বহুদিন তার প্রতিদিনের একঘেয়ে হেটে চলার কাজ থেকে অব্যাহতি পেয়ে চলে এল উনার হাতে, অস্ত্র হিসেবে।

মূহুর্মূহূ  চটাশ চটাশ শব্দ এবং ক্রমাগত "ওরে বাবা, ওরে বাবা" ধ্বনী শুনে ঘরে ছুটে এল আর্দালী সহ আরো বেশ কয়েকজন। ততক্ষনে করিম দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে যাচ্ছে। সিরাজ স্যার ধাওয়া দিতে গিয়েও আর দিলেন না। বেশি তাড়াহুড়া করতে গিয়ে করিম উলটে পড়ে গেল ঘরে। টেবিলের কোনায় আটকে লুংগী ছিড়ে যায় যায় অবস্থা। কেউ আর তাকে কিছু বল্লো না, সে প্রায় উড়ে উড়ে পালিয়ে গেল।

এই ঘটনার এক দিন পরেই সাদা কাগজে নিজের পদত্যাগ পত্র লিখে সুপারভাইজার এর হাতে দিয়ে দেন সিরাজ স্যার। অনেক বুঝিয়েও তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করাতে পারে নি কেউ।

এরপর যতদিন বেঁচে ছিলেন, শিক্ষকতা ছাড়া অন্য কোন পেশায় জড়িত হন নি সিরাজ স্যার।


Sunday, December 17, 2017

দাদার গল্প ১

তিনি  বিশ্ববিদ্যালয়ের স্টাফ কোয়ার্টারে থাকেন।  পাঁচ ছেলে ও তিন মেয়ে নিয়ে মোটামুটি বড় পরিবার। অভাব অনটন লেগেই আছে। তবে স্বস্তির বিষয় ছিল চাকরীর সূত্রে পাওয়া কোয়ার্টার। বাসা বেশি বড় না হলেও গাদাগাদি নেই। বেশ বড়সড় একটি বৈঠকখানা, দুইটি প্রশস্ত বারান্দা, তিন টি শোয়ার ঘর ও প্রক্ষালণকেন্দ্র, একটি ছোট অতিথি ঘর, আলাদা রান্নাঘর ও খাওয়ার জায়গা নিয়ে মোটামুটী আরামদায়ক বসবাস এর ব্যাবস্থা।

স্ত্রী পলিটিক্যাল সাইন্স গ্রাজুয়েট; সেকালের মাপকাঠি তে উচ্চ শিক্ষিত বলা যায় উনাকে। তখনো নারী দের শিক্ষা দীক্ষার উপর রয়েছে নানাবিধ বাধা বিপত্তি।তারপরেও তিনি বাবা মায়ের মুখ উজ্জ্বল করে পাশ করেন সময় মত। বিয়ে হয় সুযোগ্য পাত্রের সাথে।

উনার স্ত্রীর কারণে বাসায় পড়ালেখার ব্যাপারে কোন ছাড় নেই। সেই সাথে গল্পের বই পড়ার ব্যাপারেও কোন বাধা নেই, তবে তা অবশ্যই হতে হবে পড়ালেখা শেষ করে। বাসায় ছিল ছোট লাইব্রেরী, বড় ভাই বোন দের বই ছোটরাও পড়তে পারতো সময় মত। 

মাগরিবের নামাজের আগেই সবাইকে বাসায় ফিরতে হয় বাধ্যতামূলক ভাবে।  কোন দিন যদি ভুলেও একটূ দেরী হয়ে যেত, সন্তান দের মুখোমুখি হতে হত বাবার রক্তচক্ষু ও সুকঠিন জেরার। পাঁচ তলা বাসায় প্রবেশ এর এক টাই দরজা ছিল, এবং ঘরে যেতে হত বৈঠকখানার ভেতর দিয়েই। ডানপিঠে বড় ছেলের কপালে মাঝে মাঝেই জুটতো উত্তম মদ্ধ্যম। সাথে বাঁচতে পারতো না চাচাতো ফুফাতো ভাইয়েরাও। ওরা মাঝে মাঝে এসে থাকতো সে বাসায়।

সেই বৈঠকখানা অনেক শাস্তির সাক্ষী। বাবা শুধু বাসায় দেরী করে ফেরা নয়, পরীক্ষায় আশানূরুপ ফলাফল না পাওয়া, পাশের বাড়ী থেকে অভিযোগ, কারো বাসা থেকে আম চুরি করে খাওয়া কিংবা ঢিল মেরে জানালার কাচ ভেঙ্গে দাওয়া ইত্যাদি নানা রকম ছোট বড় অপরাধের বিচার হত সেই কক্ষে।

অন্দরমহল থেকে বোনেরা শিউড়ে উঠতো ভাইদের আর্তচিতকার এবং বাতাশে বেতের শপাং শপাং শব্দে। সবাই ভাবতে জোরে চিৎকার করলে শাস্তি কমে যাব, কিন্তু তা কখনোই হত না। মাঝে মাঝে উনার মেজাজ ভাল থাকলে ভিন্ন শাস্তি দিতেন। এক ভাইকে বলতেন আরেক ভাই এর কানে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে। এরকম দিন গুলো ছিল ঈদ এর মত।

পর্দার আড়াল থেকে ছোট ভাই বোনেরা হাসি মুখে উঁকি দিত ভাইদের চোখ পাকানো কে অগ্রাহ্য করে। বাবা লক্ষ্য করেও কিছু বলতেন না কারণ এ ঘটনায় শাস্তি আরো পরিপূর্ণ রূপ ধারণ করতো।

সেই স্টাফ কোয়ার্টার ভিত্তিক সমাজে তিনি কড়া বাবা হিসেবে পরিচিত ছিলেন, এবং উনার সন্তানেরাও সে কারণে আদর্শ সন্তান হিসেবে সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেত।

মেঝ কে অনেক পছন্দ করতেন উনি।  মেঝ কখনো মিথ্যা বলতো না। মেঝর নির্দোষ স্বীকারোক্তির কারণে জেষ্ঠ সন্তানের অনেক জারিজুরি ফাঁস হয়ে যেত। এ কারণে দুই ভাই এর মদ্ধ্যে একটি আদর্শগত রেষারেষি ছিল।

সবার শেষে জন্ম নেয় ছোট ভাই অঞ্জন। সবার কোলে কোলে, চরম আদরে বড় হয় সে। ততদিনে বাবা আর তেমন মারেন না সন্তান দের। সবাই মোটামুটি বড় হয়ে গিয়েছে, কেউ আর মার খাওয়ার মত কাজগুলিও করে না। তবে তিনি কখনোই বড়দের প্রতি অশ্রদ্ধা কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণকে বরদাশত করতেন না।

একদিন বাসায় ইলিশ মাছ এর ডিম রান্না হয়েছে। এক বাটিতে ঝোল শুকিয়ে ভুনা করে রান্না হওয়া তরকারী রাখলেন আম্মা। বাবা ও পাঁচ ভাই বসেছে টেবিলে। বোনেরা পরে খাবে, ওদের জন্যেও একটু তরকারী আলাদা করে রাখা আছে রান্নাঘরে। সবাই পাতে ভাত নিয়ে অপেক্ষা করছে আম্মা কখন সবাইকে ডিম ভাগ করে দিবেন। প্রথা ভংগ করে প্রথমে কনিষ্ঠ সন্তান এর পাতে আদর করে ডিম তুলে দিলেন মা।

"আমাকে এত কম দিয়েছ কেন? আমি পূরোটা চাই। আজকে আমি একাই ইলিশ এর ডিম খাব, বাকিরা পেঁয়াজ মরিচ দিয়ে খাক!" - বলে উঠলো কনিষ্ঠ।

বজ্রপাত হলেও হয়তো সবাই এত অবাক হত না। সেঝ ভাই সবার মদ্ধ্যে একটু চুপ চাপ স্বভাবের, মুখে হাত দিয়ে অবাক হয়ে চেয়ে রইল সে ছোট ভাই এর দিকে। বাকিরাও কম বেশি অবাক। বাবা মুখ খোলার আগেই বড় ভাই বলে উঠলেন "এই, এগুলা কি বলিস? সবাই মিলে খাবি না? আয় তোকে আমার থেকে একটু দিয়ে দেই"।

ছোট ভাই তাকে পাত্তা না দিয়ে তাকালো বাবার দিকে। কিন্তু মূহুর্তেই ওর আশার বেলুন চুপসে গেল।

বাবার মুখ লাল, চোখ জ্বলছে জলজল করে। সেই চোখে নেই কোন মমতা, বরং আছে অবিশ্বাস আর অদম্য রাগ।

"আমি পুরোটাই খাব, আমি পুরোটাই খাব" বলতে বলতে সেই শিশু টেবিল ছেড়ে দৌড়ে চলে গেল বারান্দায়। গলা ভাঙ্গা, কাঁদতে কাদতেই সে গেল পুরোটা পথ।

সে যুগের বারান্দা গুলো কোন ঘরের সাথে যুক্ত থাকতো না। দরজা দিয়ে আলাদা করা একটা ঘরের মত। বারান্দায় গিয়ে দরজায় খিল দিয়ে দিল সে। বাইরে থেকে ভাই বোনেরা অনেকক্ষন ধাক্কা ধাক্কি করলেও সে খুল্লো না দরজা।

এদিকে পাথর হৃদয় বাবা একবারের জন্যেও টেবিল ছেড়ে উঠলেন না। ছোট ভাই এর জন্য সবার মন কাঁদে। কেউ ছুঁয়েও দেখলো না ইলিশের ডিম। সব্জী লবণ পেঁয়াজ কাঁচামরিচ দিয়েই সেদিনের খাওয়া শেষ হল। কেউ সেভাবে খেয়াল না করলেও গিন্নি ঠিকই খেয়াল করলেন যে বাবার প্লেট থেকে আর ভাত কমেনি। খালি নাড়াচাড়া করেছেন আর খানিক্ষন।

টেবিল থেকে উঠে গিয়ে উনি স্বাভাবিক ভাবে রিডিং গ্লাস টি নিয়ে দৈনিক পত্রিকা পড়তে বসলেন বৈঠকখানায়। পরনে সফেদ লুঙ্গি আর গেঞ্জি। নামাযে যাওয়ার জন্য উঠে একটা শার্ট পরলেন। তখন স্ত্রী বললেন "ছেলেটা তো এখনো দরজা খুলে না। কি করি?"

"এসব পাত্তা দিও না। ক্ষিদা লাগলেই সুর সুর করে এসে তোমার কাছে ভাত চাইবে" বলে বেরিয়ে গেলেন।

স্টাফ কোয়ার্টার মসজিদে আসর এর নামাজ পড়ে গেলেন একই কলোনী তে অবস্থিত বন্ধু জামান এর বাসায়। তিন দান দাবা খেলতে খেলতেই মাগরিব এর সময় হয়ে গেল। মাগরিব এর নামাজ পড়ে বাসায় আসতে আসতে মনে পড়ে গেল ছোট ছেলের কথা। ১ পয়সা দিয়ে একটা কাঠি লজেন্স নিলেন ছেলের জন্য। মনে মনে ভাবলেন, বাকি ছেলে মেয়েদের চোখ এড়িয়ে ওকে এটা দিতে হবে।

বাসায় ঢুকতে ঢুকতে শুনলেন কান্নার আওয়াজ। এসে দেখলেন ছোট বোন তার ভাই এর জন্য কান্না করছে, দরজা তখনো খুলেনি।

দৌড়ে গেলেন বারান্দার সামনে। ধাক্কা দিলেন কয়েকবার, কোন সাড়া নেই। জোরে একটা লাথি দিলেন, দূর্বল কপাট ভেঙ্গে গেল। দেখলেন ছোট ছেলে কাঁদতে কাঁদতে কখন ঘুমিয়ে গেছে এক কোনায়। ঘুমের মাঝেও যেন সে অভিমানী। বারান্দার এক কোণায় শুয়ে আছে আড়াআড়ি ভাবে।ভেজা শার্ট টা খুলে ওটাকে আকড়ে রেখেছে দুই হাতের মাঝে। চারপাশ ভিজে গিয়েছে ঘাম আর কান্নায়।

কোন দিকে না তাকিয়ে ছেলেকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিলেন পরম মমতায়। পেছন থেকে বাকি সন্তানেরা দেখলো বিরল দৃশ্য। পাথরসম বাবার চোখে পানি। ছেলেকে ঘরে নিয়ে নিজে সারা গা ধুয়ে দিলেন, মুছে দিলেন আর পরিষ্কার কাপড় পরিয়ে দিলেন। এর মাঝে কখন চোখ খুলেছে সন্তান, বাবার এইরুপ আচরণে সেও মূক হয়ে গিয়েছে।

এখানেই শেষ নয়। দুপুরের সেই বেঁচে যাওয়া ইলিশ এর ডিম দিয়ে নিজ হাতে মাখিয়ে মাখিয়ে ভাত খাইয়ে দিলেন সন্তান কে পরম মমতায়। আর মনে মনে ভাবতে থাকলেন "আজ কাস্টোমস অফিস এর সেই চাকরী তা না ছাড়লে সবার জন্য একটা করে আস্ত ইলিশ এর ডিম থাকতো বাসায়"।

হঠাত বাইরের দরজায় জোরে জোরে আঘাত এর শব্দ শোনা গেল। ঘরে ঢুকলেন বন্ধু জামান ও পাড়ার আরো কয়েকজন।

"কাজ টা ভাল কর নাই সিরাজ। ছেলে মেয়ের সাথে এত জিদ করা ভাল না"।

(চলবে)

[ আমার দাদা ডক্টর সিরাজুল হক খান যখন মারা যান, উনার সন্তানেরা সবাই বেশ ছোট। বড় ছেলে মাত্র honours পরীক্ষা দিবে। উনাকে নিয়ে উনার ছেলেমেয়েদের অনেক স্মৃতি, কিন্তু উনারা বেশি বলেন না। অল্প যে কয়েকটা গল্প শুনেছি, সেগুলো নিয়ে লেখার ইচ্ছা অনেক দিনের। বন্ধু নাজমুল হুদা ও অনেকবার বলেছে লিখার জন্য। চেষ্টা করবো গল্প গুলো লিখে শেষ করতে। কে জানে, হয়তো এগুলো কে জোড়া দিয়েই কোন দিন উনার একটা পূর্নাঙ্গ আত্নজীবনী লিখে ফেলতে পারবো।

লিখতে গিয়ে বুঝলাম যে কাজ টা সহজ না। আমি দাদাকে কখনো দেখিনি, কিন্তু তাকে নিয়ে লিখতে গিয়ে চোখ ভিজে যাচ্ছিল বার বার। তাই অনেকদিন আগে শুরু করলেও আজকেই শেষ করতে পারলাম এই লেখাটি। গল্প টা মোটামুটি accurate, কিছু ডিটেলস আমি শুধু সংযোজন করেছি নিজের কল্পনা শক্তি খরচ করে। আশা করি এত লম্বা লিখা দিয়ে কাউকে বিরক্ত করি নাই]